দুঃস্থ ও রেলযাত্রীদের ত্রাতা সেখ আক্তার
অভিজিৎ হাজরা, নতুন পয়গাম, বাগনান:
তিনি কোনো সেলিব্রেটি নন, নন কোনো পদস্থ আধিকারিক কিংবা চাকরিজীবী। মধ্যবিত্তের স্বাচ্ছন্দ্যও নেই তাঁর জীবনে। দিন আনা দিন খাওয়া পরিবারের মানুষ তিনি। তবু বাগনানের অসহায় মানুষ আর রেলযাত্রীদের কাছে তিনি সত্যিকারের সেলিব্রেটি। কারণ, গত দুই দশক ধরে নিরলস সমাজসেবাই তাঁকে এই সম্মান এনে দিয়েছে। তাঁর নাম সেখ আক্তার আলি।
প্রায় ২০ বছর আগে আক্তারের পরিচয় ছিল রেলের মালবাহক বা মুটে হিসাবে। দক্ষিণ-পূর্ব রেলের হাওড়া–খড়্গপুর শাখার ব্যস্ত বাগনান স্টেশনেই ছিল তাঁর কর্মক্ষেত্র। ট্রেন থেকে নামা যাত্রীদের মালপত্র মাথায় করে পৌঁছে দিতেন বাসস্ট্যান্ড বা আশপাশের জায়গায়। কিন্তু দুর্গাপুজোর সময়, যখন হাজার হাজার যাত্রী ভিড় জমাতেন বাগনানে, তখন মালবাহকের কাজ বন্ধ রেখে তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা খুলতেন দুটি সেবাকেন্দ্র। সেখানে বিনামূল্যে জল, দুধ, বিস্কুট, বাতাসা, এমনকি ওষুধও বিলি করতেন দর্শনার্থীদের মধ্যে।
পরবর্তীতে আক্তার মালবাহকের কাজ ছেড়ে স্টেশনের ৫ নম্বর নতুন টিকিট কাউন্টারের পাশে একটি চায়ের দোকান খোলেন। তবে সমাজসেবার মানসিকতা এখনও অটুট। তিনি জানান, “আমার সাধ্য সীমিত হলেও সমাজসেবার ইচ্ছে সীমাহীন। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়াই।” অসুস্থ যাত্রীকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া, চিকিৎসার জন্য অর্থসাহায্য, কোনো দরিদ্র পরিবারের মেয়ের বিয়েতে পাশে দাঁড়ানো—এসবই তিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী করে আসছেন।
বিশেষ করে দুর্গোৎসবের সময়ে তিনি আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত দিন-রাত ভিন্ন ভিন্ন ক্যাম্পে বিনামূল্যে জল, দুধ, বিস্কুট, লজেন্স ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। দোকানের আয়ের কিছুটা আলাদা করে জমিয়ে রাখেন সারাবছর, আর পুজোর সময় সেই অর্থ ভেঙে ব্যবহার করেন সেবামূলক কাজে। আশ্চর্যের বিষয়, এর জন্য তিনি কখনো কারও কাছে সাহায্যের আবেদন করেন না।
তাঁর এই উদ্যোগে উদ্বুদ্ধ হয়ে বহু দর্শনার্থী, রেলযাত্রী ও বাসযাত্রী কেউ জল, কেউ দুধ, কেউ বা বিস্কুট-ঔষধ দিয়ে সহযোগিতা করেন। রেল কর্তৃপক্ষও তাঁর উদ্যোগের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এক রেল আধিকারিক বলেন, “সেখ আক্তারের এই সমাজসেবাকে অর্থ দিয়ে মাপা যায় না। পুজোর সময় আমরা অনেকটাই নির্ভর করি তাঁর উপর।”
শুধু সেবামূলক কাজই নয়, আক্তার আলি সচেতনতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখেন। মাইক হাতে তিনি যাত্রীদের সতর্ক করেন—রেললাইন পারাপারে ওভারব্রিজ ব্যবহার করতে, মহিলা কামরায় পুরুষ যাত্রী না উঠতে, প্ল্যাটফর্মে বিশৃঙ্খলা না করতে, কিংবা শিশুদের নিরাপত্তার জন্য মোবাইল নম্বরসহ কাগজ সঙ্গে রাখতে। প্লাস্টিক ও আবর্জনা ফেলার ব্যাপারেও তিনি ক্রমাগত প্রচার চালান।
পরিবারে অভাব থাকলেও সমাজসেবার এই অনন্য দৃষ্টান্ত ২০ বছর ধরে তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। ফলে আজ বাগনান স্টেশন থেকে শুরু করে আশপাশের অসংখ্য মানুষ তাঁকে শুধুই এক চা দোকানদার নয়, বরং “মানুষের ত্রাতা” হিসেবেই চেনে।








