পেটে ছুঁচোর ডন, মূল্যবৃদ্ধির জ্বালায় নাভিশ্বাস নির্মলা-ফর্মূলায় ঘুরিয়ে নাক দেখাচ্ছে কেন্দ্র সরকার
নতুন পয়গাম, নয়াদিল্লি, ১২ সেপ্টেম্বর:
কয়েক মাস আগে এক সমীক্ষা রিপোর্টে জানা গিয়েছিল, প্রতি রাতে না খেতে পেয়ে খালি পেটেই ঘুমিয়ে পড়ে ৬৩ লক্ষ ভারতবাসী। এবার কেন্দ্র সরকারের সমীক্ষা বলছে, খাদ্যের পিছনে ব্যয় ক্রমশ কমাতে বাধ্য হচ্ছে দেশবাসী। ব্যক্তি থেকে পরিবার খাদ্যসামগ্রী ক্রয়ের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যেখানে ২০১২ সালে দেশের গ্রামাঞ্চলে পরিবার পিছু গড়ে মাসিক খাদ্যপণ্য বাবদ খরচ হত ৫৩ শতাংশ, সেটা ২০২৪ সালে কমে হয়েছে ৪৭ শতাংশ। এখন প্রশ্ন উঠছে, খাবার দাবারে মানুষের আগ্রহ কমে বিলাসিতার দিকে আগ্রহ বাড়ছে, নাকি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধিই এর জন্য দায়ী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য সামগ্রীর আকাশছোঁয়া দামের কারণেই মূলত গ্রামীণ ভারতের গড়পড়তা মানুষজন খাওয়া দাওয়া কমাতে বাধ্য হচ্ছে বা খাদ্য সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রে আপস করতে বাধ্য হচ্ছে। অর্থাৎ পেট মেরে তারা সংসার চালাচ্ছে। তাতেও অগণিত পরিবার সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। বিগত ১২ বছরে নিত্যপণ্যের পাশাপাশি প্যাকেটজাত ও প্রাত্যহিক খাদ্যদ্রব্যের দাম এতই বেড়েছে যে, পেটের সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হচ্ছে আম জনতার একটা বড় অংশ।
এছাড়াও কেন্দ্রের ওই রিপোর্টে উঠে এসেছে আরও বিস্ময়কর তথ্য, যা জেনে মানুষের চোখ কপালে উঠে যাবার উপক্রম। শহরাঞ্চলে মানুষের আয় তুলনামূলক বেশি হলেও সেখানে খাদ্যপণ্য ক্রয়ের হার গ্রামের তুলনায় অধিক হারে কমেছে। গ্রামে গত ১২ বছরে এই হার কমেছে ৬ শতাংশ। আর শহরে কমেছে ৭ শতাংশ। শহরাঞ্চলে ২০১২ সালে খাদ্যপণ্য ক্রয়ের গড় হার ছিল ৪৭ শতাংশ, সেটা গত আর্থিক বছরে হয়েছে ৪০ শতাংশ। কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান বিভাগ ২০২৫ সালের প্রথম ত্রৈমাসিক থেকে যে হার বা প্রবণতা দেখতে পাচ্ছে, সেখানে পর্যন্ত খাদ্যপণ্য ক্রয়ের হার একইভাবে কমে যাচ্ছে। কারণ, ২০২২ থেকে লাগাতার জিনিসপত্রের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
সরকারি পরিসংখ্যানে যদিও মূল্যবৃদ্ধির হার কমতে শুরু করেছে জুলাই মাস থেকে। আগস্টে রিজার্ভ ব্যাঙ্কও জানিয়েছে, ৮ বছরের মধ্যে সবথেকে কম হারে বেড়েছে খাদ্যপণ্যের মূল্য। কিন্তু তার প্রমাণ মেলেনি বাজার এবং হেঁশেলে। তবে সরকারি পরিসংখ্যানে এটা স্পষ্ট যে, ১২ বছরে বাধ্য হয়ে খাবার বা পেটের সঙ্গে আপস করছে সাধারণ মানুষ। খিদেকে পোষ মানিয়ে ফেলেছে বহু নিম্নবিত্ত পরিবার।
এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রক ঠিক করেছে, দেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার নির্ধারণের যে পন্থা, সেই প্রক্রিয়ায় ভিত্তিবর্ষকে এবার বদলে দেওয়া হবে। বর্তমানে বেশ কিছু বছর ধরেই জিডিপি এবং মুদ্রাস্ফীতির হার নির্ধারণের ভিত্তি ধরা হয় ২০১১-১২ অর্থবর্ষকে। এবার, ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে তা বদলে হয়ে যাবে ২০২২-২৩ আর্থিক বছর। পাশাপাশি খুচরো মূল্যবৃদ্ধির হার নির্ধারণের সামগ্রিক প্রক্রিয়াতেও আসছে পরিবর্তন। বর্তমানে ৩০০ পণ্যকে ধরা হয় মূল্যবৃদ্ধির নির্ধারণে। সেটা বাড়িয়ে করা হবে ৪০০। আর স্বাভাবিকভাবেই কমানো হবে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যের অনুপাত। এখন মোট মূল্যবৃদ্ধির হিসেবে ৪০ শতাংশের বেশিই শুধু খাদ্যপণ্য। আর যেহেতু খাদ্যের দাম কমছে না, তাই এতদিন মোট মূল্যবৃদ্ধির হারও কমেনি।
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের অনেকদিনের প্রস্তাব হল, মূল্যবৃদ্ধির মানদণ্ড থেকে খাদ্যসামগ্রী বা খাদ্যপণ্যকে আলাদা করে দেওয়া হোক। কারণ, ২০২২ সাল থেকে বাকি পণ্যের দামে ওঠাপড়া হলেও খাদ্যের দাম উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। ফলে বিড়ম্বনা বা অস্বস্তি বাড়ছে কেন্দ্র সরকারের। এবার তাই দাম কমাতে না পেরে ঘুরপথে পাল্টে ফেলা হচ্ছে মূল্যবৃদ্ধি নির্ধারণের প্রক্রিয়া। যেমনটা কিছুদিন আগে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামণ বলেছিলেন, টাকার দাম কমেনি; বরং ডলারের দাম বাড়ছে। খাদ্যদ্রব্যের দাম কমাতে না পেরে এখন সেই নির্মলা-ফর্মূলাতেই ঘুরিয়ে নাক দেখানোর পথে হাঁটছে কেন্দ্র সরকার।








