উত্তরলক্ষীপুরের গর্ব: প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হতে চলেছেন ডা: মোবারাক হোসেন
নতুন পয়গাম, এম নাজমুস সাহাদাত: মোথাবাড়ির উত্তরলক্ষীপুর অঞ্চলের শুকুরদ্দিটোলা গ্রাম। একসময় এই গ্রাম পরিচিত ছিল কৃষিনির্ভর সাধারণ জনপদ হিসেবে। মাঠে-ঘাটে চাষবাস, দিনমজুরির কাজ আর অল্প আয়ের সংসার এভাবেই চলত অধিকাংশ পরিবারের জীবন। সেই গ্রাম থেকেই উঠে এসেছেন এক মুদিখানা দোকানদারের ছেলে, আজ যিনি হতে চলেছেন প্রসুতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা: মোবারাক হোসেন। তাঁর জীবনগাথা কেবল একজন চিকিৎসকের সাফল্যের কাহিনি নয়, বরং সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও পারিবারিক ত্যাগের এক অনন্য উদাহরণ। মোবারাক হোসেনের পিতা মৃত বেলাল হোসেন ছিলেন একজন সাধারণ মুদিখানা দোকানদার। মা জামেলা বিবি সংসারের হাল সামলাতেন অক্লান্ত পরিশ্রমে। পরিবারে পিতা-মাতা সহ মোট আটজন সদস্য। অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী, কিন্তু শিক্ষার প্রতি অনুরাগ ছিল অটুট। ছোটবেলা থেকেই মোবারাক ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী।উত্তরলক্ষীপুর হাই স্কুলে পড়াশোনা করাকালীন বরাবরই ক্লাসে প্রথম হতেন। মাধ্যমিক পরীক্ষায় বিদ্যালয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করে তিনি নজর কাড়েন সকলের। এরপর বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন মালদা মডেল মাদ্রাসায়। সেখানেও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় বিদ্যালয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। পড়াশোনার প্রতি তাঁর একাগ্রতা ছিল অসাধারণ। পরিবারে আর্থিক সংকট থাকলেও তিনি কখনও স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল একটাই চিকিৎসক হওয়া। সেই স্বপ্নপূরণের পথে বড় ভূমিকা নেয় রাজ্যের অন্যতম সুপরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আল আমিন মিশন, যেখানে তিনি নিট পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য কোচিং নেন। ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (নিট) উত্তীর্ণ হয়ে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পান মোবারাক।
পরিবারের মুখে তখন আনন্দের হাসি। আর্থিক সংকটের মধ্যেও যে স্বপ্ন পূরণ সম্ভব, তার বাস্তব প্রমাণ যেন এই সাফল্য। এরপর তিনি ভর্তি হন নর্থ বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল-এ। সেখান থেকে ব্যাচেলর অফ মেডিসিন, ব্যাচেলর অফ সার্জারি (MBBS) সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে নিট পিজি পরিক্ষা দেওয়ার পর স্ত্রী ও প্রসুতি রোগ বিষয়ে তিন বছর মেয়াদি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনিং শুরু করতে চলেছেন তিনি। তার পছন্দমত প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন কলকাতার আরজিকর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে। তবে এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। বড় ভাই আব্দুল কাদির নিজেও ছিলেন মেধাবী ছাত্র। কিন্তু সংসারের বেহাল দশার কারণে মাধ্যমিকের পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে তিনি ছোট ভাই মোবারাকের পাশে দাঁড়ান। দিনরাত পরিশ্রম করে সংসারের হাল ধরেন এবং ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতে সহযোগিতা করেন। মোবারাক নিজেও একাধিকবার স্বীকার করেছেন, “দাদা না থাকলে হয়তো আমি এতদূর আসতে পারতাম না।” ছোটবেলার স্মৃতি মনে করে তিনি বলেন, “আমার জন্ম এক দরিদ্র পরিবারে। ছোটবেলা থেকে পড়াশোনার প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। বাড়ির কাজকর্মের পাশাপাশি স্কুল করতাম, রাতে পড়াশোনা চালাতাম। কখনও প্রাইভেট পড়ার সুযোগ ছিল না। স্কুলের শিক্ষকরা সবসময় সাহস ও প্রেরণা দিয়েছেন।
তাঁর কথায়, উত্তরলক্ষীপুরের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে চিকিৎসক হতে পারা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। ডা. মোবারাক হোসেনের জীবনে একটি আবেগঘন অধ্যায় হলো তাঁর পিতার প্রয়াণ। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর বাবা বেলাল হোসেন ইন্তেকাল করেন। বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে বড় ডাক্তার হবে। আজ সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। মোবারাক বলেন, বাবার দোয়া ও আশীর্বাদই আমাকে এই জায়গায় এনে দিয়েছে। চিকিৎসক হওয়ার পর তিনি শহরমুখী না হয়ে নিজের এলাকাতেই কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে বাঙ্গীটোলা গ্রামীণ হাসপাতালে মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি সুজাপুর গ্রামীণ হাসপাতাল (PHC) ও মাতৃমা কেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসার ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত। তাঁর চেম্বার উত্তরলক্ষীপুরে বাঙ্গীটোলা হাসপাতালের পাশেই। নামমাত্র ২০০ টাকায় রোগী দেখেন তিনি। শুরুতে ফি ছিল ১৫০ টাকা। কিন্তু আর্থিক অস্বচ্ছল রোগীদের ক্ষেত্রে তিনি অনেক সময় বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দেন। কখনও কখনও প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনার টাকাও রোগীর হাতে তুলে দেন। গত পাঁচ বছরে প্রায় কয়েক হাজার রোগী দেখেছেন তিনি। মালদা ছাড়াও ঝাড়খণ্ড থেকে বহু রোগী তাঁর কাছে চিকিৎসা নিতে আসেন। প্রসূতি মা, কিশোরী ও নারীস্বাস্থ্য সংক্রান্ত নানা সমস্যার রোগীরা তাঁর ওপর আস্থা রাখেন।
গ্রামের মানুষ বলেন, “ডাক্তারবাবু শুধু চিকিৎসা দেন না, মন দিয়ে কথা শোনেন।” অনেকেই অন্যদের রেফারেন্স দিয়ে তাঁর কাছে নিয়ে আসেন এবং বাইরে গিয়েও তাঁর সুনাম করেন। পরিবারের অন্য সদস্যদেরও তিনি স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত হতে উৎসাহিত করেছেন। ছোট ভাই জিএনএম সম্পন্ন করেছেন, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী এএনএম-এর দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। বড় ভাবিকেও এএনএম সম্পন্ন করতে সহায়তা করেছেন তিনি। যেন পুরো পরিবারই স্বাস্থ্যসেবাকে নিজেদের দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছে। বাড়িতে বড় ভাই আব্দুল কাদির আজও পরিবারের দেখাশোনা করেন। ডা. মোবারাক হোসেনের মা ও স্ত্রীর স্বপ্ন ছিল তিনি আরও বড় চিকিৎসক হয়ে নারীদের যথাযথ সম্মান দিয়ে চিকিৎসা দেবেন। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে তিনি আবারও উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিছু সময় কলকাতায় থাকতে হবে তাঁকে। এতে অনেক রোগীই মন খারাপ করেছেন। তাঁরা বলেন, “ডাক্তারবাবু না থাকলে আমাদের খুব কষ্ট হবে।” তবে তিনি আশ্বস্ত করেছেন, আরও দক্ষ হয়ে ফিরে এসে উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা দেবেন। উত্তরলক্ষীপুরের মতো এক গ্রাম থেকে উঠে এসে আজ তিনি বহু মানুষের জীবনে আলো জ্বালিয়েছেন। তাঁর গল্প প্রমাণ করে অভাব কখনও স্বপ্নকে থামাতে পারে না, যদি থাকে অধ্যবসায়, পরিশ্রম ও পরিবারের সমর্থন। এক মুদিখানা দোকানদারের ছেলে আজ হাজারো নারীর আস্থার প্রতীক। গ্রামের মানুষ গর্ব করে বলেন, “তিনি আমাদেরই ছেলে।” আর এই পরিচয়ই ডা. মোবারাক হোসেনের সবচেয়ে বড় সম্মান ও প্রাপ্তি।








