রাষ্ট্রদোহ আইনে সাংবাদিকতা বিচার্য নয়, সুপ্রিম রক্ষাকবচ
নতুন পয়গাম, নয়াদিল্লি, ১৭ আগস্ট: সাংবাদিকদেরকে পাইকারি হারে রাষ্ট্রদ্রোহী বা দেশদ্রোহী আইনে গ্রেফতার নিয়ে কেন্দ্র সরকারকে তীব্র ভর্ৎসনা করল সুপ্রিম কোর্ট। দেশের শীর্ষ আদালত সাফ জানাল, পেশাগত দিক থেকে সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে বিচার করা যায় না। উল্লেখ্য, অপারেশন সিন্দুর নিয়ে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করায় কেন্দ্রের রোষানলে পড়ে একটি সর্বভারতীয় নিউজ পোর্টাল ও তার সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল অসমের পুলিস। দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর বিষয়গুলি এই ধারায় তাদেরকে অভিযুক্ত করা হয়। সেই মামলার শুনানি চলাকালে বিচারপতি সূর্যকান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ বলেছেন, কোনও সাংবাদিক সরকারের পলিসি বা কাজের সমালোচনা করে প্রতিবেদন করলে তা দেশের ঐক্য, সার্বভৌমত্ব বা অখণ্ডতাকে আঘাত করে না।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর উত্তর প্রদেশের হাথরাসে এক তরুণীর গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় গোটা দেশ উত্তাল হয়ে উঠলে সিদ্দিক কাপ্পান নামে কেরলের এক সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফার সেই সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে হাথরাস যাচ্ছিলেন। কিন্তু মাঝপথেই তাঁকে আটক করে উত্তরপ্রদেশ পুলিস। তার বিরুদ্ধ অভিযোগ আনা হয়, তিনি নাকি দেশদ্রোহী ষড়যন্ত্র করেছিলেন। অগত্যা কারাগারের কুঠুরিতে ঠাঁই হয় ওই তরুণ সাংবাদিকের। এই তালিকায় আরো রয়েছেন আসিফ সুলতান, প্রবীর পুরকায়স্থ, গৌতম নভালখা, ফারহাদ শাহ, সাজ্জাদ গুল, রূপেশকুমার সিং, পাওজেল চাওবা প্রমুখ বিদগ্ধ সাংবাদিক। হলুদের পরিবর্তে সাদা সাংবাদিকতাই এদের একমাত্র অপরাধ। তাই এইসব দুঁধে সাংবাদিককে রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে অভিযুক্ত করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। কারণ, এরা বিভিন্ন সময় তাদের লেখালিখির মাধ্যমে কেন্দ্র বা ডাবল ইঞ্জিন রাজ্যের সরকারের বিরুদ্ধে স্বচ্ছতা ও বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে কাজ করেছেন।
এই মামলার শুনানিতে বিচারপতি সূর্যকান্ত এদিন বলেন, একটা সংবাদ বা প্রতিবেদন কীভাবে রাষ্ট্রের ঐক্য ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি বা বিপজ্জনক হতে পারে? এরা কেউ তো অস্ত্র পাচারের মতো গুরুতর দেশবিরোধী অপরাধ করেনি। সংবাদ মাধ্যম গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সরকারের ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দেবে, এটাই তো তাদের পেশাগত দায়বদ্ধতা। এই মন্তব্য করে ওই নিউজ পোর্টাল ও তার সম্পাদককে রক্ষাকবচ দেওয়ার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট এও জানিয়েছে, আপাতত অসম পুলিশ কোনও পদক্ষেপ করতে পারবে না। কেন্দ্র সরকারকেও এই মর্মে নোটিস পাঠিয়েছে শীর্ষ আদালত।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সাল থেকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ২১টি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের হয়েছে বিভিন্ন রাজ্যে। জেলবন্দি সাত সাংবাদিকের মধ্যে পাঁচজনের বিরুদ্ধেই রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেওয়া হয়েছিল। এদের অপরাধ হল, সরকারের প্রশংসা না করে, ভিন্নমত পোষণ করা বা সরকারের সমালোচনা করা। তাই তাঁদের রাষ্ট্রদ্রোহী বা দেশদ্রোহী তকমা দিয়ে গুরুতর অভিযোগে অনির্দিষ্টকাল ধরে বিনা বিচারে জেলবন্দি করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ। দেশের বিভিন্ন রাজ্যের সাংবাদিক সংগঠন সুপ্রিম কোর্টের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে একে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার পথে নৈতিক জয় বলে অভিহিত করেছেন।








