মানবসেবার প্রতীক পিন্টু ডাক্তারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত
রবিউল ইসলাম, নতুন পয়গাম, সাগরদীঘি:
মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘি ব্লকের কাবিলপুর গ্রাম মঙ্গলবার সাক্ষী থাকল এক বিরল মানবিক মুহূর্তের। গ্রামের প্রিয় চিকিৎসক অরুণ কুমার দাস (পিন্টু ডাক্তার)–এর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় দেখা গেল ধর্ম-বর্ণের সব প্রাচীর ভেঙে যাওয়া একতার দৃশ্য। আজিমগঞ্জ শ্মশানঘাটে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে গ্রামবাসীর উপস্থিতি যেন গড়ে তুলল সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৭৬ বছর বয়সে মঙ্গলবার প্রয়াত হন কাবিলপুরের এই জনপ্রিয় গ্রামীণ চিকিৎসক। মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে সমগ্র এলাকাজুড়ে। বুধবার আজিমগঞ্জ শ্মশানঘাটে তাঁর শেষকৃত্যে উপস্থিত ছিলেন গ্রামের সকল সম্প্রদায়ের মানুষ। সবার কণ্ঠে তখন একটাই সুর—
“মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম, হিন্দু-মুসলমান— মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।”
শ্মশানঘাটে তখন অশ্রু আর শ্রদ্ধার মিশেল। গ্রামের প্রবীণ থেকে তরুণ— সকলের চোখে ভেসে উঠছিল ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার অশ্রু। সবার মুখেই এক কথা— পিন্টু ডাক্তার ছিলেন শুধু একজন চিকিৎসক নন, তিনি ছিলেন মানবসেবার জীবন্ত প্রতিমূর্তি।
কেন এমন অগাধ ভালোবাসা? স্থানীয় কাবিলপুর হাই স্কুলের শিক্ষক মুর্শিদ সারওয়ার জাহান বলেন,
“মানবসেবার এক কিংবদন্তি ছিলেন পিন্টু ডাক্তার। গরিব রোগীদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা করতেন, ওষুধ দিতেন, এমনকি রাত-বিরেতেও ডাক পড়লে ছুটে যেতেন সেবায়। তিনি শুধু কাবিলপুর নয়, সমগ্র অঞ্চলের মানুষের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত।”
গ্রামবাসীদের মতে, তাঁর ছোট্ট ফার্মেসিটি যেন ছিল এক “অঘোষিত মেডিক্যাল কলেজ”। প্রায় শতাধিক শিক্ষিত বেকার যুবক তাঁর কাছ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ নিয়ে আজ বিভিন্ন স্থানে সুপ্রতিষ্ঠিত। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন তিনি।
ডা. দাসের পরিবার সূত্রে জানা যায়, মাস ছয়েক ধরে অসুস্থ থাকলেও তিনি শেষদিন পর্যন্ত রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে গেছেন। জঙ্গিপুর কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করার পর ফার্মাসিস্ট ডিগ্রি অর্জন করে বাবার পেশাতেই নিজেকে নিয়োজিত করেন তিনি। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে চার প্রজন্মের মানুষের চিকিৎসা করে গেছেন অক্লান্ত পরিশ্রমে। তাঁর ছোট ভাই তরুণ কুমার দাসও বর্তমানে গ্রামীণ চিকিৎসক হিসেবে কাজ করছেন।
৯৫ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত কাবিলপুরের মানুষরা বলছেন,
“অমায়িক ব্যবহার, গরিবদরদী মন, নিপাট ভদ্রতা আর দক্ষ চিকিৎসা— এই গুণেই তিনি ছিলেন আমাদের আপনজন। তাঁর মৃত্যু কাবিলপুর তথা আশেপাশের এলাকার গ্রামীণ চিকিৎসা ব্যবস্থায় এক যুগের অবসান ঘটাল।”
ভাই তরুণ কুমার দাস বলেন,
“দাদার মৃত্যু কাবিলপুরবাসীর জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। আমাদের গ্রামে বহুদিন ধরে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির ঐতিহ্য বজায় আছে। আজ দাদার অন্ত্যেষ্টিতে মুসলিম ভাইদের উপস্থিতি ও সহযোগিতা সেই সম্প্রীতিরই প্রমাণ।”
পিন্টু ডাক্তারের জীবন যেন স্মরণ করিয়ে দেয়— সত্যিকারের মানুষ কখনও মরে না, তারা থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে, তাদের কর্মে, তাদের সেবার আলোয়।








