বাবা-মা শহিদ, শৈশব কেড়েছে ইসরাইলি হামলা সংসারের গুরুদায়িত্ব গাজার ইয়াতিম শিশুদের কাঁধে
নতুন পয়গাম, রামাল্লা:
দু’হাতে পানির বালতি। আশপাশে আঁকাবাঁকা ভঙ্গুর পথ। শীর্ণ দেহে ভারী এ বালতিগুলো বইতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু মাত্র ১২ বছর বয়সি মেয়েটি নিষ্ঠুর পৃথিবীর কঠিন বাস্তবতা বুঝে গেছে। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে প্রতিনিয়তই সংগ্রাম করে যাচ্ছে জানা মোহাম্মদ। যে সময়ে স্কুল প্রাঙ্গণে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে হেসে-খেলে আনন্দ করার কথা, সেই বয়সে ধরতে হয়েছে সংসারের হাল। গাজা যুদ্ধে ইসরাইলি সেনারা তার মতো অসংখ্য শিশুর শৈশব ছিনিয়ে নিয়েছে। সোনালি অতীত ফেলে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা তারা সংগ্রাম করছে ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও মৃত্যুর ভয় নিয়ে। এমনই এক শিশুর জীবন সংগ্রামের গল্প শুনে পাঠকরা নিশ্চিত শিউরে উঠবেন।
গাজার ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে গোলাপি সোয়েটার গায়ে পানির বালতি হাতে জানা মোহাম্মদের পথচলা যেন এক অবিরাম যুদ্ধ। ইসরাইলি স্নাইপারের গুলিতে নিহত হয় তার বড় ভাই। তারও আগে শহিদ হয়েছেন তার বাবা-মা। এরপর থেকে পরিবারের দায়িত্ব তার ঘাড়ে এসে পড়েছে। অসুস্থ দুই ভাই-বোনকে ভাল রাখতে জানা প্রতিদিন সংগ্রাম করে খাবার ও পানি জোগাড় করে। গাজায় পানি সংগ্রহের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ১২ বছরের ছোট্ট এই মেয়েটি বলল, ‘আমি চাই না আমার বাবা-মায়ের রূহ কষ্ট পাক। তাই আমি শক্ত হয়ে উঠেছি। তিন ভাই-বোনের খাবারের সন্ধানে সারাদিন হন্যে হয়ে ছোটাছুটিই তার প্রতিদিনের রুটিন।
চা বিক্রি করে পরিবারকে খাওয়াচ্ছে খালিদ:
মধ্য গাজা উপত্যকার দেইর আল-বালাহ বাজারে চা বিক্রি করে খালিদ আবু হাসিরা। ১৩ বছর বয়সি এই বালক ব্যবসা করে এখন পরিবারের ভরণ-পোষণের জোগান দিচ্ছে। ইসরাইলি বিমান হামলায় তার বাবা শহিদ হওয়ার পর এখন খালিদই তার পরিবারের শেষ ভরসা। তাঁবুতে ফ্যাকাশে চেহারা নিয়ে খালিদের মা জানান, ‘এতটুকু ছেলের চায়ের দোকানই আমাদের আয়ের একমাত্র উৎস। সে তার বয়সের চেয়ে অনেক বড় হয়ে গেছে। এখন সে তার শৈশব আনন্দে কাটাতে পারত, কিন্তু যুদ্ধ আমাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে’।
পরিবারের জন্য রান্না করে সলাহ:
উত্তর গাজার ১২ বছর বয়সী আবদুল্লাহ সলাহ। পরিবারের জন্য খাবার জোগান থেকে শুরু করে রান্নাবান্নাও করে সে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে তাঁবু পরিষ্কার, তারপর রান্নার জন্য রসদ খুঁজতে বের হয়। পণ্য জোগাড় করে পরিবারের ২০ জন সদস্যের জন্য রান্না করে সে। দুঃখ প্রকাশ করে সলাহ বলে, ‘কাঠ, গ্যাস, খাবার, ময়দা… এখানে কিছুই নেই। আমরা আশ্রয় কেন্দ্রে আমাদের তাঁবুতে পৌঁছানো পর্যন্ত দীর্ঘ দূরত্ব ধরে পানি ভর্তি বোতল বহন করি’। ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে গাজার শিশুরা করুণ নিয়তির শিকার। ফলে আট বছর কিংবা তারও কম বয়সী শিশুরাও পরিবারের সদস্যদের বাঁচানোর জন্য কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। শিক্ষা এবং শৈশব হারিয়ে এই শিশুরা এখন পরিবারের অন্ন সংস্থানের কঠিন দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে।
১৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ আশু কাঁধে চায়ের ফ্লাস্ক নিয়ে গাজা সিটির রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, পথচারীদের কাছে চা বিক্রি করে। তার এখন স্কুলে থাকার কথা ছিল। কিন্তু ইসরাইলের একতরফা যুদ্ধে তার বাবা নিহত হওয়ার পর তাকে পড়াশোনা ছেড়ে পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হতে হয়েছে।
সে জানায়, এই বয়সে এই গুরুদায়িত্ব বহন করা আমার জন্য নয়। চায়ের ফ্লাস্ক, কাপ নিয়ে এভাবে রাস্তায় রাস্তায়, অলি-গলিতে ঘুরে বেড়ানো, এটা অনেক বেশি পরিশ্রমের। আমি ক্লান্ত, কিন্তু আমার ভাই-বোনদের জন্য আমাকে এটা করতেই হবে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গাজায় অন্তত ৪০ হাজার শিশু তাদের বাবা-মা বা দু’জনের কাউকে না কাউকে, অনেকে আবার দু’জনকেই হারিয়েছে। ২ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসরাইলি বিমান হামলায় গাজা উপত্যকার অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় এমন অসংখ্য ইয়াতিম, মিশকিন শিশু কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের পরিবারকে রক্ষা করতে গিয়ে এই শিশুরা শুধু শিক্ষাই নয়, তাদের মূল্যবান শৈশবও হারাচ্ছে।
আশুর মা আতাদ সেখ কাঁদতে কাঁদতে জানান, এতটুকু ছেলে সংসার চালাচ্ছে। ওকে দেখে খুব কষ্ট হয়। কিন্তু ওর সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। ওর বাবা মারা যাওয়ার পর, আমাদের আয়ের আর পথ খোলা নেই। মোহাম্মদ আশুর বড় ভাই কাজ খুঁজে পাচ্ছে না এবং তিনি নিজেও পরিবারের জন্য কিছু করতে পারছেন না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সে এখনও শিশু, কিন্তু এমন এক বড় দায়িত্ব তাকে বহন করতে হচ্ছে, যা তার জন্য উচিত নয়। পরিস্থিতিই আমাদের এদিকে ঠেলে দিয়েছে।
ইউনিসেফের মুখপাত্র টেস ইনগ্রাম-এর মতে, যুদ্ধ গাজার শিশুদের ওপর চরম আঘাত হেনেছে। শিশুরা এখন আবর্জনা ঘেঁটে টুকরা ধাতু বা জ্বালানির কাঠ খুঁজছে, কিংবা চা-কফি বিক্রি করছে। সবজি ফেরি করছে। ইউনিসেফের তরফে এসব অসহায় পরিবারগুলোকে নগদ অর্থ সহায়তা এবং শিশুশ্রমের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করার মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছে।
সেভ দ্য চিলড্রেন-এর মধ্যপ্রাচ্যের ডাইরেক্টর রাচেল কামিংস বলেন, এই যুদ্ধ পারিবারিক বন্ধন ও কাঠামোকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। ফলে শিশুরা ছোট ভাই-বোন বা বয়স্কদের যত্ন নেওয়ার মতো ভূমিকা নিতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক শিশু চোখের সামনে বাবা-মা, ভাই-বোনদেরকে রক্তাক্ত অবস্থায় ছটফট করতে করতে শহিদ হওয়া দেখে ট্রমায় চলে গেছে, কেউ কেউ বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে, কেউ কেউ দৃষ্টি হারিয়েছে, কেউ হাত-পা হারিয়েছে, কেউ শ্রবণ শক্তি হারিয়েছে। গাজা এখন ভরে গেছে ইয়াতিম, মিশকিন ও প্রতিবন্ধীতে। গাজার প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী ১৮ বছরের নিচে। ৬ লাখ ৬০ হাজারের বেশি শিশু বর্তমানে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। অন্তত দেড় লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে।








