পাইগোড়ার নীল ব্যানার্জি: পথ কুকুরদের বন্ধু, মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত
খান সাহিল মাজহার, নতুন পয়গাম, বীরভূম
মানুষের এই ব্যস্ত জীবনের ভিড়ে যেখানে অনেকে নিজের জন্য সময় বের করতে পারেন না, সেখানে খয়রাশোলের পাইগোড়া গ্রামের এক যুবক নিজের ২১ বছর বয়সেই এমন এক কাজ শুরু করেছেন, যা আজ গোটা এলাকার মানুষের মন জয় করে নিয়েছে। তার নাম নীল ব্যানার্জি। সাধারণ এক গ্রাম্য পরিবারের সন্তান হলেও তার কাজ একেবারেই অসাধারণ এবং সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।
প্রতিদিন সকালে বা সন্ধ্যায় রাস্তার মোড়ে, গ্রাম্য পথে, বা নির্জন জায়গায় আমরা অসংখ্য পথ কুকুরকে ঘুরে বেড়াতে দেখি। ক্ষুধার জ্বালায় তারা প্রায়ই আবর্জনার স্তূপে খাবারের খোঁজে নেমে যায়। কিন্তু এই অসহায় প্রাণীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন নীল। তিনি কেবল কথা দেননি, প্রতিদিন নিজের হাতে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করছেন।
নীলের সংস্থা “জীব সেবা সমিতি”—নামেই যার উদ্দেশ্য স্পষ্ট। এই সমিতির মূল কাজ হলো প্রতিদিন এলাকার পথ কুকুরদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা। নীল একা নন, আরও কয়েকজন যুবক এই কাজে তাকে সহযোগিতা করেন। প্রতিদিন ৭০ থেকে ১০০ টা কুকুরের জন্য বড় ভোজের আয়োজন করা হয়। ভাত আর মাংস সিদ্ধ করে বাড়িতেই রান্না হয় সেই খাবার। তারপর থালার মতো পাত্রে করে প্রত্যেকটি কুকুরকে আলাদাভাবে খাওয়ানো হয়।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই খাবারে কোনও তেল, লঙ্কা বা মশলার ব্যবহার করা হয় না। কারণ, কুকুরদের শরীরে ক্ষতি হতে পারে সেই ভেবে শুধুই সিদ্ধ ভাত ও চিকেন দেওয়া হয়। যেন সত্যিই এক মায়ের মতো যত্ন করে তাদের জন্য খাবার তৈরি করা হচ্ছে।
গ্রামের মানুষ প্রথমে অবাক হলেও আজ তারা গর্বিত নীলের এই উদ্যোগে। অনেকে বলেন, এত অল্প বয়সে কেউ সাধারণত নিজের ক্যারিয়ার, পড়াশোনা কিংবা চাকরির দিকেই মনোযোগ দেয়। কিন্তু নীল নিজের সময়, শ্রম আর ভালোবাসা উজাড় করে দিচ্ছেন সেইসব প্রাণীদের জন্য, যাদের পাশে দাঁড়ানোর কথা ভাবেন না অধিকাংশ মানুষ।
এই কাজ শুধু খাবার দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নীল নিজে বিশ্বাস করেন, প্রাণীরা মানুষেরই মতো সমাজের অংশ। তারা কথা বলতে পারে না, কিন্তু তাদেরও অনুভূতি আছে, ক্ষুধা আছে। আর সেই ক্ষুধার কষ্ট মেটানোই তার জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আশেপাশের এলাকায় অনেকেই অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। কেউ কেউ অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে চাইছেন, আবার কেউ নিজের সময় দিয়ে এই কাজে যুক্ত হতে আগ্রহী হচ্ছেন।
নীল ব্যানার্জির এই মানবিক উদ্যোগ প্রমাণ করে দেয়—মানুষের বড় হওয়ার জন্য টাকা-পয়সা, গাড়ি-বাড়ি, বা খ্যাতির প্রয়োজন নেই। দরকার কেবল একটা বড় মন। তার এই দৃষ্টান্ত শুধু পাইগোড়া নয়, গোটা সমাজের জন্য শিক্ষণীয়। আমরা যদি প্রত্যেকে সামান্য একটু করেও অসহায় প্রাণীদের পাশে দাঁড়াই, তবে পৃথিবী সত্যিই আরও সুন্দর হয়ে উঠবে।
নীলের স্বপ্ন একদিন তার এই “জীব সেবা সমিতি” আরও বড় হবে। তিনি চান আরও বেশি মানুষ এগিয়ে আসুক এবং প্রত্যেকটি প্রাণী অন্তত দিনে একবেলা তৃপ্তির সঙ্গে খাবার খেতে পারে। তার বিশ্বাস, মানুষ চাইলে প্রতিটি প্রাণীর জীবনই হতে পারে ভালোবাসায় ভরা।
এমন এক মানবিক উদ্যোগের সামনে মাথা নত করে শ্রদ্ধা জানাতেই হয়—২১ বছরের নীল ব্যানার্জি আমাদের চোখে এক অনন্য প্রেরণা।








