ডেউচা-পাঁচামি খনি প্রকল্প নিয়ে গণ-কনভেনশন
নতুন পয়গাম, সিউড়ি, ২৩ সেপ্টেম্বর:
বীরভূম জেলার সিউড়িতে অনুষ্ঠিত গণ-কনভেনশন ডেউচা-পাঁচামি-দেওয়ানগঞ্জ-হরিণসিঙ্গা অঞ্চলে তথাকথিত কয়লাখনি প্রকল্পের নামে বেআইনি জমি অধিগ্রহণ, আদিবাসী-সহ স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদ এবং অবৈধ ব্যাসল্ট খননের বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিবাদ জানাল এই কনভেনশন।
অতীতে দু-বার ডেউচা-পাঁচামিতে কয়লাখনি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০০৮ সালে কোল ইন্ডিয়ার সাথে মিলে এনএমডিসি এবং ডব্লিউবিএমডিটিসিএল যৌথ উদ্যোগে খনি প্রকল্প শুরুর প্রচেষ্টা করে। কিন্তু শেষমেষ কোল ইন্ডিয়া উৎসাহ না দেখানোয় প্রকল্প এগোয়নি। এরপর ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রক পশ্চিমবঙ্গ-সহ ছটি রাজ্যকে দেউচা-পাঁচামি কয়লা ব্লকটি বরাদ্দ করেছিল, কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সেই কয়লা ব্লক বণ্টন বাতিল হয়ে যায়। এরপর ২০১৯-এর ডিসেম্বরে পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমকে এই কয়লা ব্লকটি পুনরায় বরাদ্দ করা হয়।
ডেউচা-পাঁচামিতে খননযোগ্য কয়লার পরিমাণ আনুমানিক ১২০ কোটি টন হলেও এখানে কয়লার স্তর চাপা পড়ে আছে ৯০ মিটার থেকে ২৪৫ মিটার পুরু ব্যাসল্ট স্তরের নীচে। এত গভীরের কয়লার স্তর থেকে কয়লা উত্তোলন বেশ কঠিন, ফলে অর্থনৈতিকভাবে প্রকল্পটি অলাভজনক।
প্রস্তাবিত কয়লাখনি প্রকল্পের জন্য রাজ্য সরকারের জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া অভিসন্ধিমূলক এবং বেআইনি। রাজ্যের বিদ্যুৎ দপ্তরের জারি করা ১৬ নভেম্বর ২০২১ তারিখের আদেশনামা অনুযায়ী বীরভূমের মহম্মদবাজার ব্লকের অন্তর্গত দশটি মৌজায় ৩৪০০ একর জমি এই প্রকল্পের জন্য চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ২২৬৭ একর জমি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন, ২০৩ একর বনাঞ্চল এবং বাকিটা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অধীনে। এই কয়লাখনি করতে গেলে ৪৩১৪ পরিবারের ২১,০৩৩ জন মানুষকে উচ্ছেদ করতে হবে, যার মধ্যে ৯০৩৪ জন আদিবাসী এবং ৩৬০১ জন তফসিলি।
এই ধরনের বড় প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ২০১৩ সালের আইন অনুযায়ী সামাজিক প্রভাব সমীক্ষা করে গ্রামসভা ডেকে গণশুনানি করে প্রতিটি সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সম্মতি নেওয়ার কথা। রাজ্য সরকার এসব কিছুই না করে প্রস্তাবিত খনি এলাকায় জমি অধিগ্রহণ শুরু করে দেয়। জমিহারাদের জুনিয়র পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাত্র ২৫ শতাংশ আবেদনকারী পরিবারকে নিয়োগের সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বিশ্ববাংলা বাণিজ্য সম্মেলনে ঘোষণা করেন, ডেউচা-পাঁচামি প্রকল্প থেকে একশো বছরের জন্য কয়লার জোগান পাওয়া যাবে এবং লক্ষাধিক কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু আদালতে জমা দেওয়া সরকারি হলফনামা ও নথিপত্র থেকে স্পষ্ট হয়েছে, আজ পর্যন্ত এই প্রকল্পের জন্য কোনো কয়লা খনির লিজ বা খনন পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়নি। কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রকের বরাদ্দ চুক্তি অনুযায়ী ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রয়োজনীয় অনুমোদন জমা দেওয়ার কথা ছিল, যা করা হয়নি। ফলে, কয়লাখনি প্রকল্প কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। বেসরকারি কোনো সংস্থাও এই প্রকল্পে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায়নি। অর্থাৎ, ফেব্রুয়ারিতে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা ছিল ভিত্তিহীন ও জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে এক প্রকার প্রতারণা।
কয়লা খনি প্রকল্পের নামে যা চলছে, তা হল ব্যাসল্ট বা কালো পাথরের জন্য খনন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে রাজ্য মন্ত্রিসভা পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমকে ৪৩১ একরের বেশি জমিতে ব্যাসল্ট উত্তোলন ও বিপণনের অনুমোদন দেয়। সরকারি অনুমান, এই ব্যাসল্ট খনন থেকে মুনাফা হবে ৫৬০০ কোটি টাকা। ব্যাসল্ট খননের জন্য বেসরকারি সংস্থা বাছাই করার টেন্ডার বিজ্ঞপ্তিতে বিদ্যুত দপ্তর জানায়, প্রথমে ১২ একর জমিতে ব্যাসল্ট উত্তোলনের কাজ শুরু হবে এবং পরে খনির আয়তন ধাপে ধাপে বেড়ে ৩২৬ একর পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ বড় খনি প্রকল্পের জন্য বাধ্যতামূলক জনশুনানি এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ণের নিয়ম এড়াতে খনি প্রকল্পকে ছোট ছোট ভাগে ভেঙে প্রথমে ‘পাইলট প্রোজেক্ট’-এর নামে ছোট আয়তনের পাথর খনির পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্র সরকারের পরিবেশ দপ্তর এই ছলচাতুরিকে প্রশ্রয় দিয়েছে।
ব্যাসল্ট খনির টেন্ডার বা দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়ায় গুরুতর কারচুপি হয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম প্রথমে ‘ট্রান্সমেরিন’ নামে এক বেসরকারি সংস্থাকে খননের দায়িত্ব দিলেও ২০২৫ সালের এপ্রিলে টেন্ডারের শর্ত ভেঙে সেই সংস্থার ৬০ শতাংশ মালিকানা ‘হিমাদ্রি স্পেশালিটি কেমিক্যাল’ নামে বৃহৎ কোম্পানির হাতে চলে যায়। মাত্র ১৫৪ কোটি টাকার বিনিময়ে প্রায় ১৬০০ কোটি টাকার মুনাফার প্রকল্পের এই হাতবদল প্রশ্ন তোলে: বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগম কি ইচ্ছাকৃতভাবে এই দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছে? এই প্রক্রিয়ায় একাধিক ভুয়ো বা কাগুজে কোম্পানির নাম ব্যবহার হয়েছে, যা বৃহত্তর দুর্নীতির ইঙ্গিত বহন করে।
গণ-কনভেনশনের দাবি, এই প্রকল্প শুধু বেআইনি নয়, স্থানীয় মানুষের জীবন, জীবিকা ও প্রকৃতি-পরিবেশের ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। কয়েক হাজার আদিবাসী, দলিত ও সংখ্যালঘু পরিবার উচ্ছেদের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। জল, জঙ্গল ও জমির ওপর নির্ভরশীল প্রান্তিক সমাজের সংস্কৃতি ও অস্তিত্বকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই খনিজ দূষণের ফলে বাতাস ও জল দূষিত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে জলের মারাত্মক সঙ্কট দেখা দেবে। প্রকল্পের লাভ হবে কয়েকটি কোম্পানি ও শাসকদলের মদতপুষ্ট চক্রের, আর ক্ষতি হবে সাধারণ মানুষের।
এমতাবস্থায় গণকনভেনশনের দাবি, ডেউচা-পাঁচামিতে তথাকথিত কয়লাখনি ও ব্যাসল্ট খনন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। রাজ্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন নিগমের মাধ্যমে সংঘটিত বেআইনি খনন, দুর্নীতি ও খনির বরাত হাতবদল নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে। আদিবাসী ও স্থানীয় গ্রামবাসীদের সম্মতি ছাড়া কোনো খনি প্রকল্প চাপিয়ে দেওয়া চলবে না। ১৯ সেপ্টেম্বর বীরভূমের সিউড়িতে আয়োজিত এই কনভেনশনের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন প্রসেনজিৎ বসু ও গৌতম ঘোষ।








