‘প্রধান-পতি’র ছায়া নয়, আসল নেতা তিনিই সুন্দরবনের মৈপিঠ বৈকুণ্ঠপুরের জ্যোৎস্না হালদার পেলেন দেশের শিশুযত্ন সম্মান
হাসান লস্কর বাবলু, নতুন পয়গাম, সুন্দরবন, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা
জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ পঞ্চায়েত বহুদিন ধরেই দেখাচ্ছে গ্রামীণ ভারতের এক বাস্তব চিত্র। যেখানে নির্বাচিত লেডি প্রধান নামমাত্র মুখ্য, আর তাঁর স্বামী প্রধান-পতি ই চালান সবকিছু। কিন্তু সুন্দরবনের কুলতলীর মৈপিঠ বৈকুণ্ঠপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে এই গল্প একেবারেই উল্টো।
সেই গ্রামের প্রধান জ্যোৎস্না হালদার, যিনি নিজের পরিশ্রম, সাহস ও নেতৃত্বে প্রমাণ করেছেন—একজন নারীই পারেন সমাজে পরিবর্তন আনতে। তিনিই এই বছর দেশের অন্যতম সম্মান, ইন্ডিয়া চাইল্ড কেয়ার চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড ২০২৫, অর্জন করেছেন। পুরস্কারটি যৌথভাবে প্রদান করেছে FORCES (Forum for Creche and Child Care Services) ও Mobile Creches, জাতিসংঘ ঘোষিত ইন্টারন্যাশনাল ডে অফ কেয়ার অ্যান্ড সাপোর্ট উপলক্ষে নয়াদিল্লির ইন্ডিয়া ইসলামিক কালচারাল সেন্টার-এ।জ্যোৎস্না হালদার নির্বাচিত হয়েছেন
জনপ্রতিনিধি বিভাগে জাতীয় সেরার স্বীকৃতি নিয়ে। সুন্দরবনের মতো দুর্গম অঞ্চলে শিশু জলে ডুবে যাওয়া ড্রাউনিং রোধে তাঁর নেতৃত্বে শুরু হয়েছে এক অনন্য কমিউনিটি-নির্ভর উদ্যোগ। চাইল্ড ইন নিড ইনস্টিটিউট সিনি CINI এর সহায়তায় গড়ে উঠেছে দুটি জীবনরক্ষাকারী শিশু যত্ন কেন্দ্র—‘কবচ’ অর্থাৎ “অস্ত্র” বা “রক্ষা”)—একটি মৈপিঠ এ, আরেকটি ভূবনেশ্বরী গ্রাম পঞ্চায়েতের চৌরঙ্গীতে। এই সেন্টারে গত এক বছরে একটিও শিশু আহত বা দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়নি—একেবারে শূন্য দুর্ঘটনা।এই মডেলকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক, ভারত সরকার এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO India) প্রশংসা করে জানিয়েছে—“এটি সারা ভারতের জন্য এক আদর্শ মডেল।” জ্যোৎস্না এই উদ্যোগকে গ্রাম পঞ্চায়েত উন্নয়ন পরিকল্পনা (GPDP)-এর অন্তর্ভুক্ত করতেও সক্ষম হয়েছেন—যা দেশের প্রথম নজির।পুরস্কার গ্রহণের সময় জ্যোৎস্না বলেন, “এই পুরস্কার প্রতিটি মা, প্রতিটি শিশু এবং সিনি পরিবারের। ঝড়ঝঞ্ঝার মধ্যেও যাঁরা আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন, তাঁদের প্রতি এই শ্রদ্ধা। এই কাজ সম্ভব হত না যদি আমাদের মাননীয়া ব্লক সভাপতি শ্রীমতি রূপা সরদার এবং কুলতলির বিডিও শ্রী সুচন্দন বৈদ্য পাশে না থাকতেন। তাঁদের সহায়তাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।”
অনুষ্ঠানে অভিনেত্রী মন্দিরা বেদী বলেন,,
“প্রতিটি শিশুর যত্ন ও নিরাপত্তা পাওয়া তাদের অধিকার। ভারত এগোবে তখনই, যখন ছোটদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।”
চাইল্ড ইন নিড ইনস্টিটিউট (CINI)-এর ন্যাশনাল অ্যাডভোকেসি অফিসার (ইনজুরি প্রিভেনশন) সুজয় রায় বলেন,
“জ্যোৎস্না হালদার দেশের প্রথম মহিলা প্রধান, যিনি শিশুর ডুবে যাওয়া রোধে এমন উদ্যোগ শুরু করেছেন। ICMR ও The George Institute (TGI)-এর সহায়তায় তাঁর কাজ সত্যিই প্রশংসনীয় এবং দেশজুড়ে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।”
স্থানীয় বিধায়ক শ্রী গণেশচন্দ্র মণ্ডল বলেন, “রাজ্য সরকার শিশু-বান্ধব বাংলা গড়ার প্রতিশ্রুতিতে অটল। নারী নেতৃত্ব ও শিশু সুরক্ষার এই সম্মান পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নারী-ক্ষমতায়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বাস্তব প্রতিফলন।”
সিনির প্রতিষ্ঠাতা ড. সমীর নারায়ণ চৌধুরীর কথায়, “যে সুন্দরবন একসময় ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত হতো, আজ সেই মৈপিঠ বৈকুণ্ঠপুর থেকেই দেশকে পথ দেখাচ্ছেন জ্যোৎস্না হালদার। তিনি প্রমাণ করেছেন—‘শিশুর যত্নই দেশের ভবিষ্যৎ।








