ক্রেউং উপজাতি: কম্বডিয়ার মাতৃতান্ত্রিক সমাজ
সামিমা খাতুন
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দো-চীন উপদ্বীপের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত দেশ কম্বোডিয়া। এই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজ কাঠামো নানা দিক থেকেই অনন্য। আয়তনে প্রায় ১ লক্ষ ৮১ হাজার ৩৫ বর্গকিমি. এই দেশটির উত্তর-পশ্চিমে থাইল্যান্ড, উত্তরে লাওস, পূর্বে ভিয়েতনাম এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে থাইল্যান্ড উপসাগর। রাজধানী নমপেন। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় মৌসুমী জলবায়ু, টোনলে সাপ হ্রদ ও মেকং ব-দ্বীপকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এর জীবনযাত্রা। উত্তর-পূর্বে সবুজ পাহাড় ও অরণ্যে ঘেরা রাতানাকিরি প্রদেশে বাস করে এক বিস্ময়কর আদিবাসী জনগোষ্ঠী, ক্রেউং উপজাতি। ছোট্ট জনসংখ্যা, সরল জীবনযাপন, কিন্তু তাদের সমাজ কাঠামোয় লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত সুন্দর বার্তা – নারীর মর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রকৃত উদাহরণ।
ক্রেউং সমাজের সবচেয়ে আলোচিত প্রথা হল তাদের “ভালবাসার ঘর” (Love Hut)। মেয়েদের বয়স ১৩ বছর হলে পরিবারের সদস্যরা তাদের জন্য একটি ছোট্ট ঘর তৈরি করে, যা কন্যার একান্ত ব্যক্তিগত স্থান। বিবাহ হয় সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে। কোনো জোরজবস্তি, চাপ বা সামাজিক বাধ্যবাধকতা নয়।

ক্রেউং সমাজের নেতৃত্ব মূলত নারীদেরই হাতে। অর্থাৎ এই সমাজ পিতৃতান্ত্রিক বা পুরুষতান্ত্রিক নয়, সম্পূর্ণ মাতৃতান্ত্রিক। পারিবারিক সিদ্ধান্ত, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠান — সব ক্ষেত্রেই নারীর ভূমিকা প্রধান। সম্পর্ক বা বিবাহে পুরুষের ইচ্ছার আগে নারীর মতামতই প্রাধান্য পায়। সমাজে এই সম্মান এতটাই স্বাভাবিক যে, ক্রেউং নারীরা নিজেদের জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে আত্মবিশ্বাসী ও স্বনির্ভর। ২০১৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, কম্বোডিয়ায় প্রায় ২২,৩৮৫ জন ক্রেউং জনগোষ্ঠীর মানুষ বাস করে। মূলত রাতানাকিরি, মন্ডলকিরি ও স্টংট্রেং প্রদেশে তাদের বসতি। নিজেদের স্বতন্ত্র ভাষা, পোশাক, সংস্কৃতি ও আচার আজও তারা আগলে রেখেছে। প্রযুক্তির স্পর্শ ও আধুনিক শিক্ষার প্রভাব এখন পাহাড়ি অঞ্চলেও পৌঁছেছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ’ভালবাসার ঘর’ কিছুটা হারাতে বসেছে। তবুও প্রবীণরা বিশ্বাস করেন, এই প্রথাই তাদের সংস্কৃতির প্রাণ, যা সম্পর্কের ভিত গড়ে তোলে সম্মান, আন্তরিকতা ও মানবিকতার ওপর।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ক্রেউং সংস্কৃতি হল প্রাকৃতিক সমতা ও মানবিক সম্পর্কের এক ব্যতিক্রমী মডেল। যেখানে ভালবাসা মানে পারস্পরিক সম্মান, বিবাহ মানে সমান অধিকার, আর সম্পর্ক মানে আত্মনির্ভরতা।
আজকের পৃথিবীতে যখন বহু সমাজে নারী স্বাধীনতা এখনো প্রশ্নের মুখে, তখন পাহাড়ের কোলে বাস করা এই ছোট্ট উপজাতি বিশ্বকে শিখিয়েছে, সভ্যতা মানে কেবল প্রযুক্তিগত উন্নতি নয়, বরং মানবিকতার বিকাশও।
ক্রেউং সমাজ আমাদের এক গভীর শিক্ষা দেয় — নারী বা পুরুষ নয়, সম্পর্কের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত সমান মর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মান। আর সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে আধুনিক ও মানবিক। সংস্কৃতি মানে মানুষের আত্মা। আর ক্রেউংদের সেই আত্মা আজও বেঁচে আছে ভালবাসার ঘরে।








