গাজাগামী নৌবহরে ইসরাইলি হামলা, আটক ফ্লোটিলার ৫০ জাহাজ ও ৪৫০ বিশিষ্টজন
বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ
ইহুদি কূটনীতিকদের বহিষ্কারের নির্দেশ কলম্বিয়ার
জলদস্যুর মতো কাজ করেছে নেতানিয়াহু: এরদোগান
নতুন পয়গাম, মাদ্রিদ, ৩ অক্টোবর:
গাজা অভিমুখী নৌবহরে হামলা চালিয়ে ৪৪ দেশের কয়েকশ সমাজসেবী, ত্রাণকর্মী ও মানবাধিকারকর্মীকে আটক করল ইসরায়েলি সেনারা। ফিলিস্তিনের গাজা অভিমুখে যাত্রা করা ত্রাণবাহী নৌবহর ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’-র প্রায় সব নৌযানে থাকা সেলিব্রিটিদের আটক করেছে ইসরায়েল। আটকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুইডিশ জলবায়ু ও পরিবেশ আন্দোলনের নেত্রী তরুণী গ্রেটা থুনবার্গ। ইসরায়েলের এই পাশবিক পদক্ষেপকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বলে উল্লেখ করে নিন্দা ও প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে বহু দেশ।
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ৪২টি নৌযানের মধ্যে মাত্র একটি তখন পর্যন্ত ইসরায়েলি বাধা এড়িয়ে গাজা অভিমুখে এগিয়ে যাচ্ছিল। অন্য নৌযানগুলোয় থাকা অন্তত ৪৪৩ জন অধিকারকর্মীকে আটক করেছে ইসরায়েল। একটি বাদে ফ্লোটিলার সব নৌযান থামিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েল। নৌযানগুলোতে গাজাবাসীর জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাদ্য, চিকিৎসাসামগ্রী, তাঁবু ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছিল।
গাজায় প্রায় দুই বছর ধরে ইসরায়েলের ব্যাপক নৃশংসতার মধ্যে ত্রাণবাহী এই নৌবহর আটকে দেওয়ার ঘটনা ঘটল। গত দুই বছরে উপত্যকাটিতে ৬৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি ইসরায়েলের অবরোধে সেখানে দেখা দিয়েছে খাবারের তীব্র সংকট। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজার বাসিন্দারা প্রতিদিন প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র এক চতুর্থাংশ খাবার পাচ্ছেন।
এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের অবরোধ ভেঙে ভূমধ্যসাগর দিয়ে গাজায় ত্রাণ সরবরাহ করতে যাচ্ছিল গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা। কিছুটা প্রতীকী হলেও এই মানবিক মহৎ উদ্যোগ বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা ছোট ছোট অনেক নৌযান নিয়ে ৩১ সেপ্টেম্বর স্পেন থেকে ত্রাণ নিয়ে গাজা অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। পরে তিউনিসিয়া, ইতালি ও গ্রিস থেকে বহরে আরও নৌযান যুক্ত হয়। শেষ পর্যন্ত নৌযানের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৫০টি।
গাজা উপকূলের মাত্র ১৩০ কিমি. কাছে চলে যাওয়ার পর বুধবার রাতে নৌবহরে হানা দেয় ইসরায়েলি বাহিনী। নৌযানগুলোকে যাত্রাপথ পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হয়। তারপর ইসরায়েলি নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে সেনারা ত্রাণবাহী নৌযানগুলোয় প্রবেশ করে। বন্ধ করে দেওয়া হয় সব রকম যোগাযোগব্যবস্থা। জলকামান দিয়ে হামলা চালানো হয়। অধিকারকর্মীদের দিকে বন্দুক তাগ করে থাকতে দেখা যায় ইসরায়েলি সেনাদের।
ফ্লোটিলায় ৪৪টি দেশের প্রায় ৫০০ আরোহীর মধ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া-সহ বিভিন্ন দেশ এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাংসদ, আইনজীবী, অধিকারকর্মী, চিকিৎসক ও সাংবাদিকেরা। আটক হওয়ার আগে গ্রেটা থুনবার্গ এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘আমাকে অপহরণ করা হয়েছে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনী আমাকে নিয়ে গেছে। আমাদের মানবিক যাত্রাটি ছিল অহিংস এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনেই। সরকারকে আমার ও অন্যদের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানাতে বলুন।’
জানা গিয়েছে, ইসরায়েলের আশদোদ বন্দরে আটক ব্যক্তিদের রাখা হতে পারে উচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে। রাষ্ট্রসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের দূত ড্যানি ড্যানন বলেন, ইসরায়েলে ইয়ম কিপুর উৎসব উপলক্ষে ছুটি চলছে। ছুটি শেষে নৌযান থেকে আটকদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। ততদিন পর্যন্ত তাদেরকে দক্ষিণ ইসরায়েলের কোতজিওত কারাগারে রাখা হবে। ইসরায়েলের নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেনগাভির বলেন, আগেও গাজার দিকে রওনা দেওয়া বিভিন্ন নৌবহর করা হয়েছিল। কিন্তু এবার আটকদের কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো দেশের উপকূল থেকে সমুদ্রের গভীরে ২২ কিলোমিটার এলাকার নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ণ সার্বভৌমত্ব থাকে ওই দেশের।
এরপর আরও ৩৭০ কিলোমিটার এলাকা বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে কিছু কার্যক্রম চালাতে পারে ওই দেশ। সেখানে অন্য দেশের নৌযান ও আকাশযান স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারে। ১৯৮২ সালে জাতিসংঘের সনদে সমুদ্র-আইনে বলা হয়েছে, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সব দেশের পতাকাবাহী নৌযান স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারবে। পাশাপাশি সেখানকার আকাশে উড়োজাহাজ চলাচল করতে পারবে। এদিকে ফ্লোটিলায় ইসরায়েলের হস্তক্ষেপের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালত বা আইসিজে-তে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন নৌবহরে থাকা আইনজীবীরা। নৌবহর থেকে সাংবাদিক হাসান মাসুদ বলেন, ইসরায়েল যেসব আন্তর্জাতিক ও সমুদ্র আইন লঙ্ঘন করেছে, সেগুলো প্রমাণ হিসেবে নথিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করে রাখা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে নিন্দা, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ:
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় ইসরায়েলের বাধার প্রতিবাদে বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ হয়েছে। বুধবার রাতে হামলা শুরুর পরপরই ইতালি, কলম্বিয়া, তিউনিসিয়া, গ্রিস, আয়ারল্যান্ড, তুরস্ক, স্পেন, মালয়েশিয়া, জার্মানি, আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সে বিক্ষোভ শুরু হয়। শুক্রবার ইতালিতে ধর্মঘট হয়েছে। এসব দেশে রাস্তা, রেল অবরোধের পাশাপাশি ইসরাইলি দূতাবাস ও কনসুলেটের সামনে ফিলিস্তিনের পতাকা এবং গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার ছবি নিয়ে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে গর্জে ওঠেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, ফ্লোটিলায় হামলা করে জলদস্যুর কাজ করেছে ইসরাইলি সেনারা। নৌবহরে থাকা কারও যেন কোনো ক্ষতি না হয়। তুরস্কের বিদেশ মন্ত্রক বলেছে, নৌবহরে ইসরায়েলের হামলা ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’। তুর্কি প্রেসিডেন্ট আরো বলেছেন, ইসরাইল তো গাজায় যুদ্ধ, গণহত্যা এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েই যাচ্ছে। ফিলিস্তিন তথা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি তাদের পছন্দ নয়। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল থেকে সর্বত্র বিমান ও বোমা হামলা করছে। ত্রাণের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অনাহারে অর্ধাহারে থাকা ক্ষুধার্ত মানুষদের পর্যন্ত হত্যা করা হচ্ছে। হিটলারকেও ছাড়িয়ে গেছে নেতানিয়াহু। এমন পাশবিক রাষ্ট্রপ্রধান বিশ্বে আর কেউ নেই।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো তার দেশ থেকে ইসরায়েলের সব কূটনীতিককে বহিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। নিন্দা জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। এ ঘটনায় ইসরাইলের সমালোচনা করেছে কাতার, বেলজিয়াম, আয়ারল্যান্ড, ব্রাজিল, মেক্সিকো, মিসর ও যুক্তরাজ্য।








