শিক্ষায় ইসলামের ঐতিহাসিক অবদান ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা
সেখ মঈনুল হকঃ মানবসভ্যতার ইতিহাসে শিক্ষা একটি মৌলিক ভিত্তি। জ্ঞানচর্চা ও নৈতিক উৎকর্ষ ছাড়া কোনো জাতি বা সমাজ টেকসই উন্নতির পথে অগ্রসর হতে পারে না। ইসলামের আবির্ভাবের পর থেকেই শিক্ষা ও জ্ঞানার্জন মানব জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পবিত্র জীবনবিধান আল কুরআনের প্রথম অবতীর্ণ বাণী “ইকরা” (পড়ো)-ই প্রমাণ করে, ইসলাম মূলত একটি জ্ঞানভিত্তিক ধর্ম।
ইসলামের শিক্ষাদর্শন:
ইসলাম শিক্ষাকে কেবল পার্থিব সাফল্যের মাধ্যম হিসেবে নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা ও মানবকল্যাণের পথ হিসেবে বিবেচনা করেছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরয (আবশ্যিক)।” এই দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষা ব্যবস্থাকে সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করেছে।
ঐতিহাসিক অবদান:
ইসলামী সভ্যতার স্বর্ণযুগে (৮ম থেকে ১৩শ শতাব্দী) শিক্ষা ও গবেষণায় অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়। বাগদাদের বায়তুল হিকমাহ, কর্ডোবার বিশ্ববিদ্যালয়, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়-সহ অসংখ্য মাদরাসা ও জ্ঞানকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি গণিত, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, রসায়ন ও ভূগোল ইত্যাদি শিক্ষা দেওয়া হত।
ইবনে সিনা, আল-খারিজমি, আল-ফারাবি, ইবনে রুশদ প্রমুখ মুসলিম মনীষীর গবেষণা ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভিত্তি রচনা করে। শূন্যের ব্যবহার, বীজগণিতের বিকাশ, চিকিৎসা বিজ্ঞানে ক্লিনিক্যাল পদ্ধতির সূচনা — সবই ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার উজ্জ্বল অবদান।
নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা:
ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়। জ্ঞানকে ক্ষমতা বা আধিপত্যের হাতিয়ার না বানিয়ে তা মানবকল্যাণে ব্যবহারের শিক্ষা ইসলাম দেয়। সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, সহনশীলতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা — এসব গুণাবলি ইসলামী শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা:
আজকের বিশ্বে যখন শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে কেবল চাকরি ও প্রতিযোগিতার উপকরণে পরিণত হয়েছে, তখন ইসলামের সমন্বিত শিক্ষাদর্শন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে নৈতিক শিক্ষা সংযুক্ত না হলে সমাজে অবক্ষয়, সহিংসতা ও বৈষম্য বাড়ে — যা আমরা প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করছি।
ইসলাম শিক্ষা ও বিজ্ঞানকে পরস্পরবিরোধী নয়; বরং পরিপূরক হিসেবে দেখে। তাই বর্তমান সময়ে ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে চিন্তাশীলতা, গবেষণা ও মানবিকতা একসঙ্গে বিকশিত হবে।
উপসংহার:
শিক্ষায় ইসলামের ঐতিহাসিক অবদান কেবল অতীতের গৌরব নয়; বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও এক শক্তিশালী দিকনির্দেশনা। একবিংশ শতাব্দীর সিকিভাগ পেরিয়ে এই সত্য নতুন করে উপলব্ধি করা জরুরি — জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবতার সমন্বয়ই পারে একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতে।
(লেখক: আইনজীবী ও সভাপতি, বেঙ্গল মাইনোরিটি ফোরাম)







