শিক্ষা কি কেবল চাকরির সিঁড়ি?
সেখ মঈনুল হক:বর্তমান সমাজে ‘শিক্ষা’ শব্দটির অর্থ যেন ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। আজ শিক্ষা বলতে আমরা প্রায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি বিষয়ই বুঝি- চাকরি। শিশুকাল থেকেই পরিবার, সমাজ এবং শিক্ষাব্যবস্থা সম্মিলিতভাবে শিশুদের শেখাতে থাকে কীভাবে ভালো নম্বর আনতে হয়, কীভাবে বড় ডিগ্রি অর্জন করতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে একটি নিরাপদ ও স্থায়ী চাকরির নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। এই নিরবচ্ছিন্ন প্রতিযোগিতার আবহে শিক্ষা তার গভীরতর মানবিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে — শিক্ষা কি কেবল জীবিকা অর্জনের সিঁড়ি, নাকি এর লক্ষ্য আরও ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী?
নিঃসন্দেহে শিক্ষা মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একটি ভাল চাকরি মানুষের জীবনযাত্রাকে স্বচ্ছল করে, সামাজিক মর্যাদা দেয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে স্থিতিশীল করে তোলে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তবে সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন শিক্ষা শুধুমাত্র চাকরি পাওয়ার উপকরণে পরিণত হয় এবং এর বাইরে আর কোনো মূল্যবোধ বহন করে না। তখন আমরা এমন এক সমাজের মুখোমুখি হই, যেখানে মানুষ শিক্ষিত হলেও মানবিক নয়, দক্ষ হলেও নৈতিক দায়িত্ববোধে দুর্বল।
চারপাশে তাকালেই দেখা যায় — উচ্চশিক্ষিত, ডিগ্রিধারী বহু মানুষ আছেন, যাদের আচরণে সততা, সহানুভূতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব স্পষ্ট। দুর্নীতি, অসহিষ্ণুতা, লোভ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার সমাজে ক্রমেই স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। এই বাস্তবতা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে — শিক্ষা যদি মানুষের চরিত্র, বিবেক ও নৈতিকতা গঠনে ব্যর্থ হয়, তবে সেই শিক্ষার সাফল্য কোথায়?
প্রকৃত শিক্ষা কেবল পেশাগত দক্ষতা তৈরি করে না; এটি মানুষকে চিন্তাশীল, যুক্তিবাদী ও দায়িত্ববান নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। শিক্ষা শেখায়, কীভাবে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে হয়, কীভাবে ন্যায় ও অন্যায়ের সীমারেখা নির্ধারণ করতে হয় এবং কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হয়। একই সঙ্গে শিক্ষা মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও সামাজিক সংবেদনশীলতা জাগ্রত করে। সমাজের দুর্বল, বঞ্চিত ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা শিক্ষার অন্যতম মৌলিক লক্ষ্য হওয়া উচিত।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক চর্চা ক্রমশ গুরুত্ব হারাচ্ছে। পাঠ্যসূচিতে তথ্যের পরিমাণ ও পরীক্ষার চাপ বাড়লেও ‘মানুষ গড়া’-র বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। শিক্ষা আজ অনেকাংশেই পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও ফলাফলনির্ভর হয়ে উঠেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা নম্বর ও ডিগ্রির পেছনে ছুটলেও মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
পরিণতিতে আমরা এমন এক প্রজন্ম গড়ে তুলছি, যারা প্রযুক্তিতে দক্ষ ও তথ্যে সমৃদ্ধ হলেও মানবিকতায় দরিদ্র। তারা নিজের সাফল্য ও স্বার্থের বাইরে সমাজের বৃহত্তর কল্যাণ নিয়ে ভাবতে শেখে না। একটি সুস্থ, ন্যায়ভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজের জন্য এই প্রবণতা নিঃসন্দেহে এক গভীর অশনি সংকেত। কারণ, রাষ্ট্র ও সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে কেবল দক্ষ কর্মীর ওপর নয়; বরং নৈতিক ও দায়িত্ববান নাগরিকের ওপর।
এই বাস্তবতায় শিক্ষাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার সময় এখনই। শিক্ষা যদি কেবল চাকরির সিঁড়িতে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে আমরা দক্ষ কর্মী পেলেও দায়িত্ববান মানুষ পাব না — যা কোনো জাতির জন্যই শুভ লক্ষণ নয়। রাষ্ট্র, সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত দায়িত্ব হল, এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা সমান গুরুত্ব পাবে।
পাঠ্যক্রম, শিক্ষক-প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে এই দৃষ্টিভঙ্গির সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটাতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য নয়; বরং ন্যায়বোধসম্পন্ন, সহানুভূতিশীল ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সমাজের দুর্বল মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই একটি শিক্ষিত জাতির প্রকৃত পরিচয়।
শিক্ষার একটি স্বাভাবিক ফল হতে পারে চাকরি, কিন্তু মানবিক মানুষ তৈরি হওয়াই শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য। শিক্ষা যদি মানুষের বিবেক জাগ্রত করতে ব্যর্থ হয়, তবে সে শিক্ষা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী নয়; বরং নৈতিকভাবে দুর্বল করে তুলবে। তাই আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি — শিক্ষাকে কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার নয়; বরং মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্য অর্জনই নির্ধারণ করবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটা আলোকিত, দায়িত্ববান ও মানবিক হয়ে উঠবে।
(লেখক: আইনজীবী ও সভাপতি, বেঙ্গল মাইনরিটি ফোরাম)







