সরকারি জমি দখলের অভিযোগ, মহকুমা হাসপাতালের গা ঘেঁষে বেআইনি নির্মাণ ঘিরে তীব্র বিতর্ক..!
প্রীতিময় সরখেল, নতুন পয়গাম, ধূপগুড়ি: ধূপগুড়িতে এ যেন সরকারি জায়গা দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সমস্ত বেআইনি কাজ এখানে স্বীকৃত-ধূপগুড়ির ঘটনাগুলো থেকে এমনটাই মনে হতে পারে। ধূপগুড়িতে ফের সরকারি জমি দখলের অভিযোগ, মহকুমা হাসপাতালের গা ঘেঁষে বেআইনি নির্মাণ ঘিরে তীব্র বিতর্ক। ধূপগুড়িতে যেন সরকারি জমি দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, এমনটাই অভিযোগ উঠছে একের পর এক ঘটনায়। সরকারি জায়গা দখল করে বেআইনি নির্মাণ কার্যত স্বীকৃত হয়ে যাচ্ছে বলেই মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এবার নতুন করে অভিযোগ উঠেছে ধূপগুড়ি পুরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত মহকুমা হাসপাতালের গা ঘেঁষে থাকা সরকারি পূর্ত দপ্তরের জমি দখল করে নির্মাণ কাজ শুরু হওয়া নিয়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালের পাশের ওই সরকারি ফাঁকা জায়গা টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে দিনরাত জোরকদমে চলছে বেআইনি নির্মাণ। আরও অভিযোগ, প্রতিটি ঘর এককালীন প্রায় তিন লক্ষ টাকায় বিক্রি করার পরিকল্পনা রয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ধূপগুড়ি শহরে মহকুমা হাসপাতালের ৬ তলা নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২৮ কোটি ৭৬ লক্ষ টাকা ব্যয়ে এই ছয় তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। হাসপাতালের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ তৈরি হওয়ার কথা- একটি মিলন সংঘ ক্লাবের পাশ দিয়ে এবং অন্যটি সুহৃদ সংঘ ক্লাবের পাশ দিয়ে।
কিন্তু অভিযোগ উঠছে, হাসপাতালের সুহৃদ সংঘ ক্লাব ও পাঠাগারের পাশের ওই ফাঁকা সরকারি জমিতেই বেআইনিভাবে নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ায় ভবিষ্যতে হাসপাতালের নির্ধারিত রাস্তা ও গেট নির্মাণ নিয়েই তৈরি হয়েছে সংশয়। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ, এই বেআইনি নির্মাণের নেপথ্যে রয়েছেন শাসক দলের দুই প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা, যাঁরা সহকারী ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের মদতেই এই দখলদারি চলছে বলে দাবি স্থানীয়দের। প্রসঙ্গত, তৃণমূল সুপ্রিমো ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিক প্রশাসনিক বৈঠক থেকে রাজ্য জুড়ে বেআইনি নির্মাণ ও সরকারি জমি দখলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও ধূপগুড়িতে কেন একের পর এক বেআইনি কাজ বন্ধ হচ্ছে না, তা নিয়েই উঠছে বড় প্রশ্ন। তাহলে কি শাসক দলের নেতারা মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশকে উপেক্ষা করছেন, নাকি প্রশাসনিক কর্তাদের একাংশের নীরব সম্মতিতেই চলছে এই বেআইনি কার্যকলাপ।
জানা গেছে, বিষয়টি ইতিমধ্যেই জেলাশাসক এবং মহকুমা শাসকের নজরে আনা হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় বিরোধীদের অভিযোগ, তাতেই সমাজবিরোধীদের দুঃসাহস আরও বাড়ছে। এদিকে প্রশ্ন উঠছে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকাকেও ঘিরে। যে রাস্তা ভবিষ্যতে মহকুমা হাসপাতালের জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কথা, বিশেষ করে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীদের পরিবার যাঁরা কোয়ার্টারে বসবাস করেন, সেই গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা দখল করে যদি বেআইনিভাবে নির্মাণ হয়, তাহলে হাসপাতালের পরিকাঠামো গড়ে উঠবে কীভাবে? সব মিলিয়ে, শাসক দলের প্রভাবশালীদের যোগসাজশের অভিযোগে পুলিশ ও প্রশাসন কি কোনও পদক্ষেপ নিতে সাহস পাচ্ছে না– এই প্রশ্নই এখন ধূপগুড়ির সর্বত্র।
মহকুমা নাগরিক মঞ্চের সম্পাদক অনিরুদ্ধ দাশগুপ্ত বলেন, “এটা ধূপগুড়ির একটি স্থায়ী সমস্যা। মানুষকে সচেতন হতে হবে। হাসপাতাল একটি সেনসিটিভ জায়গা, যেখানে সব সময় বহু মানুষ চিকিৎসা করাতে আসেন। এখানকার যাতায়াতের জায়গা দখল করে যদি অবৈধ নির্মাণ হয়, সেটা মেনে নেওয়া যায় না। প্রশাসনের চোখের সামনেই এগুলো হচ্ছে। আমরা আশা করব প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। ইতিমধ্যে আমরা বিষয়টি মহকুমা শাসককে জানিয়েছি।” বিজেপি জেলা সাধারণ সম্পাদক চন্দন দত্ত বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ কে মানে? ধূপগুড়িতে প্রশাসন আছে বলে মনে হয় না। সরকারি জায়গা চিহ্নিত করে একভাবে জমি মাফিয়াদের দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে এই জায়গাগুলি সরকারি, আপনারা দখল করুন। প্রভাবশালী এক তৃণমূল নেতা হাসপাতালের গেট হওয়ার জায়গা দখল করে নির্মাণ কাজ করাচ্ছেন। সমস্তটাই দিনের আলোতে টিনের বেড়া দিয়ে চলছে। পুলিশ প্রশাসন, বিডিও, এসডিও—সবাই জানেন, সব জেনেও চুপ। যাঁদের দেখভালের দায়িত্ব রয়েছে, তাঁরা শুধুমাত্র আই ওয়াশ ছাড়া কিছুই করেন না। এখনও পর্যন্ত একটিও সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করতে পারেনি বা পুনরুদ্ধার করতে পারেনি প্রশাসন।”
বাপি দাস, ক্লাবের সদস্য, দাবি করেন, “এখানে পুরনো দোকান ছিল সরকারি জায়গার মধ্যে। টিন ভেঙে যাওয়ায় নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে। ধূপগুড়ি পৌরসভার প্রাক্তন ভাইস চেয়ারম্যান রাজেশ কুমার সিংয়ের সঙ্গে আলোচনা করেই আমরা পূর্ত দপ্তরের জায়গায় নির্মাণ কাজ করছি। যেহেতু আমাদের ক্লাবের পাশে এবং আমাদেরই তত্ত্বাবধানে ছিল, তাই আমরা করছি।” রাজেশ কুমার সিং, ধূপগুড়ি পৌরসভার প্রাক্তন ভাইস চেয়ারম্যান তথা তৃণমূল জেলা সাধারণ সম্পাদক বলেন, “অন্যায় কাজ কখনও কাউকে করতে বলি না। অবিলম্বে সেই অবৈধ নির্মাণ ভাঙা হবে। আমরা বিষয়টি প্রশাসনকে অবগত করব। ইতিমধ্যে মহকুমা শাসক নোটিস করে কাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন বলে আমি জানি।”
ধূপগুড়ি ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক অঙ্কুর চক্রবর্তী বলেন, “হাসপাতালের বাইরের যে জায়গা দখল করে নির্মান হচ্ছে সেটি পূর্ত দপ্তরের জায়গা। ভবিষ্যতে সে দিক দিয়ে আমাদের মহকুমা হাসপাতালে রাস্তা হবার কথা রয়েছে। বিষয়টি আমরা পূর্ত দপ্তরকে লিখিত আকারে জানাবো যাতে সেই জায়গা দখলমুক্ত করা হয়। শ্রদ্ধা সুব্বা, মহকুমা শাসক বলেন, “এই বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। আমাকে তদন্ত করে দেখতে হবে।”








