ডিজিটাল যুগে মাটির বাড়িই যেখানে ঐতিহ্য
নতুন পয়গাম, মুর্শিদাবাদ, ২ সেপ্টেম্বর: শহরের বহুতল আবাসনে মানুষ যেন ডাল-পালা মেলতে পারছে না। তারা যেন সব বনসাঁই হয়ে বসবাস করছে। তাই কংক্রিটের জঞ্জালে ঘেরা শহরে গ্রামের মানুষের যেন দম বন্ধ হয়ে আসে। এখন অবশ্য গ্রামও অনেক বদলে গেছে। গ্রামের মানুষজনের আচরণে এখন অল্পবিস্তর হলেও শহুরে হাবভাব ও শহুরে গন্ধ পাওয়া যায়। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখন গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরা হচ্ছে। অনেককাল আগে গ্রামে মাটির বাড়ি থাকলেও এখন আর খুব একটা দেখা যায় না।
এখন মাটির বাড়ি, মাটির রাস্তা দেখতে হলে শহরতলী ছাড়িয়ে রওনা দিতে হবে সুদূর গ্রাম-গঞ্জে। তবে আরামবাগ, মেদিনীপুর, বীরভূম, বাঁকুড়া কিংবা উত্তর বঙ্গের কিছু এলাকায় মাটির বাড়ি এখনও বহুকালের সাক্ষী হয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। মুর্শিদাবাদ জেলার এসব গ্রামের মাটির বাড়িগুলোর গায়ে আজো লেগে আছে পুরনো দিনের সোঁদা মাটির গন্ধ, কাঁথা-সেলাই করা মায়ের আঁচল, কাদা-মাটি দিয়ে দাদুর হাতে গড়া সংকীর্ণ সিঁড়ির ধাপ, মা-ঠাকুমার হাতে লেপা উঠোন। এই গ্রামগুলো প্রধানত কৃষিপ্রধান।
একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল যুগে এমনই ব্যতিক্রমী এলাকা হল মুর্শিদাবাদের নবগ্রাম থানার অন্তর্গত মাধুনিয়া, সাঁকুরিয়া, শিবপুর। এখানে রয়েছে অনেক একতলা ও দোতলা মাটির বাড়ি, যা দেখতে শহর থেকে ছুটে আসেন পর্যটকেরা। এই গ্রামের যেদিকেই তাকাবেন, শুধু বিরল ৮০-১০০ বছরের পুরনো মাটির বাড়ি এখনও অক্ষত রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এই গ্রামকে বলেন ‘জীবন্ত জাদুঘর’। এখনো সেসব বাড়িতে বসবাস করছে মানুষ। তাই বলে, তারা সবাই যে খুব গরিব — তা কিন্তু নয়। কারো কারো আর্থিক সংগতি থাকলেও তারা বাপ-দাদার তৈরি ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘর-বাড়ি এখনও টিকিয়ে রেখেছেন। এই গ্রামে কিছু পাকা বাড়ি থাকলেও বেশিরভাগই মাটির বাড়ি। যেগুলো স্বাধীনতার অনেক আগে থেকে ইতিহাসের বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী, এখনও বিলীন হয়ে যায়নি।
এসব বাড়ির দেয়াল, কুলুঙ্গি, চৌকাঠ, উঠোনের ধুলোকণায় লুকিয়ে আছে অতীতের কাহিনি। পরতে পরতে লুকিয়ে আছে আদ্যিকালের মানুষের জীবনযাপন, লোকাচার, রীতিনীতি, প্রথা ও পরম্পরা, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি আর অমলিন আবেগ। তাই এসব বাড়ি খুবই নস্টালজিক। একটা সময় ছিল, যখন ঘরে আলো আসত কুপি আর হারিকেন থেকে। চুলা বা উনুনে রান্না হত গাছের শুকনো পাতা, খড়-কাঠ, ধানের তুঁষ কিংবা কুড়ের আগুনে। ছেলেপুলেরা পুকুরে সাঁতার কেটে স্নান করত। মেয়েরা কলসি কাঁকে পুকুর থেকে জল নিয়ে আসত। সেই জলেই রান্নাবান্না, হাঁড়ি-বাসন মাজা, জামা-কাপড় কাচা, ঘর মোছা নয় লেপা — ইত্যাকার যাবতীয় গৃহস্থলির কাজকর্ম হত। সন্ধ্যা নামলে মাটির ঘরের দাওয়া কিংবা উঠোনে বসত গল্প দাদুর আসর। দাদু-ঠাকুমারা গল্পের ঝুলি থেকে বের করতেন হরেক কিসিমের কাহিনি। ভুত-পেত্নি, দত্যি-দানব, রাজা-রানি, পক্ষীরাজের জীবন্ত রূপকথা — সবই গোগ্রাসে শুষে নিত নাতি-পুতিরা।








