জামালউদ্দীন আফগানি কতটা প্রাসঙ্গিক
সাইফুল খান
জামালউদ্দীন আফগানী (১৮৩৮-১৮৯৭) ছিলেন ঊনিশ শতকী মুসলিম জাহানের রাজনৈতিক রেনেসাঁর অগ্রপথিক। তাঁর জন্ম ইরান বা আফগানিস্তানে হলেও নিজেকে আফগান হিসেবে পরিচয়ে তুলে ধরেন। তিনি ছিলেন একাধারে ইসলামী চিন্তাবিদ, রাজনৈতিক কর্মী, দার্শনিক, বক্তা ও এক ঐতিহাসিক চরিত্র, যিনি ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মুসলিম জাহানকে জাগাতে চেয়েছিলেন। তার জীবনের বড় অংশ কেটেছে ইরান, ভারত, মিশর, ইস্তাম্বুল, রাশিয়া ও প্যারিসে।
জামালউদ্দীন আফগানী কোনো নির্দিষ্ট মাদ্রাসার পণ্য নন; বরং তিনি ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের এক জ্বলন্ত প্রতীক। হাল আমলে মাদ্রাসার সাইনবোর্ড দিয়ে ইসলামকে পরিচয় করানোর প্রবণতা বিভাজনের বিষ — সেটা তিনি আগেই বুঝেছিলেন। মুসলমানদের মধ্যে যে ঘুম, নির্জীবতা ও বিভক্তি সে সময় ঘিরে ধরেছিল, তার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক বজ্রকণ্ঠ প্রতিবাদ।
ঊনিশ শতকে মুসলিম বিশ্বের চিত্র ছিল করুণ। একদিকে উসমানীয় সাম্রাজ্য তার ঐতিহ্য হারাচ্ছিল, অপরদিকে ভারতবর্ষ, আলজেরিয়া, মিশর-সহ বহু অঞ্চল ব্রিটিশ ও ফরাসি ঔপনিবেশিকদের করতলে। একদিকে পশ্চিমা শক্তির প্রযুক্তি ও সামরিক আধিপত্য, অন্যদিকে মুসলিমদের আত্মসন্তুষ্টি, বৈজ্ঞানিক পশ্চাদপদতা, অভ্যন্তরীণ ফিতনা। এই প্রেক্ষাপটে জামালউদ্দীন আফগানী উপলব্ধি করলেন: “মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয় ও ইতিহাসই তাদের জন্য একমাত্র ঐক্যের ভিত্তি হতে পারে।” এই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় প্যান ইসলাম-ইজম। একটি একটি পুরোদস্তুর আন্দোলন, যা মুসলিম বিশ্বকে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে একত্র করার স্বপ্ন দেখায়।
আফগানীর দৃষ্টিতে, প্যান ইসলাম-ইজম ছিল:
১) উম্মাহ ভাবনার পুনরুজ্জীবন: শিয়া-সুন্নি, আরব-আজম, মাযহাব ও জাতিগত ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ইসলামের সাধারণ ভিত্তিতে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া।
২) সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিরোধ: তিনি মনে করতেন, ইউরোপের রাজনৈতিক চতুরতা ও সামরিক দখলের একমাত্র জবাব মুসলিম জাহানের ঐক্য ও রাজনৈতিক সংগঠন।
৩) খিলাফতের প্রতি আনুগত্য: তিনি ওসমানীয় খেলাফতের নেতৃত্বে এক বৃহৎ মুসলিম সম্মিলন গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। যেখানে খিলাফত হবে কেবল ধর্মীয় নয়; বরং রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও কেন্দ্রভূমি।
৪) ধর্ম ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধন: আফগানী মুসলিমদের কুসংস্কার ও তাত্ত্বিক জড়তা থেকে বের করে এনে ধর্মকে যুক্তিবাদ, বিজ্ঞান, শিক্ষা ও প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি বক্তৃতা, বিতর্ক ও সাংবাদিকতাকে প্রধান হাতিয়ার বানান। মিশরের রাজধানী কায়রোতে তিনি ও তার শিষ্য মুহাম্মদ আবদুহ যৌথ উদ্যোগে চালু করেন ঐতিহাসিক পত্রিকা ‘আল-উরওয়া আল-উসকা’। এই পত্রিকা ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ ও মুসলিম বিভাজনের বিরুদ্ধে এক বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহের চেহারা নেয়।
তিনি পারস্য, ভারত, মিশর, তুরস্ক, রাশিয়া, ফ্রান্স সব জায়গাতেই মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আন্দোলনের এক আন্তর্জাতিক কাঠামো দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। তাঁর কিছু নিজস্ব রচনা যেমন- “Refutation of the Materialists” এবং “Khatirat Jamal al‑Din al‑Afghani” প্রাসঙ্গিক হলেও, তার ভাবনার সংকলন পাওয়া যায় “An Islamic Response to Imperialism” বইতে, যা তার বক্তৃতা, চিঠিপত্র ও পত্রিকার সংকলন। এসবেই ফুটে ওঠে তার প্যান ইসলাম-ইজম মতাদর্শ বা দর্শনের ভিত। আফগানীর প্যান ইসলাম-ইজম ছিল সময়ের চ্যালেঞ্জের জবাব। এটি ছিল রাজনৈতিক চিন্তাগত এক বিপ্লব। যা ধর্ম পলায়নবাদ নয়, বরং সংগ্রামের রসদ, মুসলিম জাতিসত্তার বিভাজনের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা, পশ্চিমা আধিপত্যকে শুধুই সামরিক নয়, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে চ্যালেঞ্জ করা; ইসলামকে কেবল অতীতের নয়, ভবিষ্যতের সভ্যতারও পাথেয় হিসেবে দাঁড় করানো।
তিনি রাজনৈতিক ইসলাম বলতে শুধু শাসন নয়, বরং আত্মপরিচয়ের কথা বলেন। আজকের মুসলিম বিশ্বে আফগানীর স্বপ্ন কতখানি বাস্তবায়ন হয়েছে, সে প্রশ্ন আবারও ঘুরে ফিরে আসে। মধ্যপ্রাচ্যে বিভক্তি, ইসলামোফোবিয়া, পশ্চিমা আধিপত্য, মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর পরস্পর বিরোধ — এসবই প্রমাণ করে যে, তাঁর ভাবনা আজ সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
তুরস্ক, ইরান, কাতার, পাকিস্তান ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো মাঝে মাঝে ইসলামী ঐক্যের কথা বললেও সেটি অনেকটা প্রতীকী। আফগানীর মতো রাজনৈতিক পণ্ডিত ও ধর্মীয় স্কলারদের সম্মিলন ছাড়া প্যান ইসলাম-ইজমের বাস্তবায়ন আজও দূরতম স্বপ্ন।
জামালউদ্দীন আফগানীর প্যান ইসলাম-ইজম ছিল এক সম্ভাবনার দর্শন। এটি শুধু ইতিহাস নয়, বরং ভবিষ্যতের দিশারীও হতে পারে। যখন মুসলিম-বিশ্ব পশ্চিমা আধিপত্যের ছায়ায় দিন গুনছে, তখন আফগানীর কণ্ঠস্বর যেন আবারও বলে ওঠে: “তোমরা যদি এক হও, তাহলে আল্লাহর সাহায্যও তোমাদের সঙ্গে আসবে। বিভাজনে শুধু পরাজয় আছে, একত্বে আছে পুনর্জাগরণ।” (লেখক: ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক)








