হুগলীতে তাবলিগ ইজতেমা-২০২৬
ইব্রাহিম মণ্ডল, নতুন পয়গাম: এক আলাদা অনুভূতি, খোদাভীতি, সংযম ও সম্প্রীতির আর এক নাম।
আমি সত্যি অভিভূত হয়েছি বিশ্ব ইজতেমায় আগতদের দেখে। অনেক সমস্যা আছে। থাকার, খাওয়ার, টয়লেটের, স্নান বা গোসলের। সবথেকে বেশি যে কষ্ট, যারা ইজেতেমা শুরু হওয়ার পরে গেছেন তাদের অনেককে প্রায় ৩-৪ঘণ্টা পায়ে হেঁটে পৌঁছতে হয়েছে। তবুও নেই কোন অভিযোগ, হই হট্টগোল, অসন্তোষ। একদলকে দেখলাম, তারা এখনো টয়লেট ঠিক করেই যাচ্ছেন। কেননা, ঠিক না করলে বা সাফ-সুতরো না করলে কাতারে কাতাকে মানুষ যে আসছে, তাদের সুবিধা দেবেন কীভাবে। আল্লাহর কাছে তারা কি কৈফিয়ত দেবেন, সরকারের কাছে তাদের নেওয়ার তেমন কিছু নেই, তারা প্রায় সম্পূর্ণ নিজেদের উপর নির্ভরশীল।
এত মানুষ, তবুও ভিড়ের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। পুলিশি ব্যবস্থা প্রচুর দেওয়া আছে, কিন্তু নিজেদের ভলান্টিয়ারই যথেষ্ট। যদিও আরো সুন্দর গোছানো পরিপাটি হলে ভাল হত। কিন্তু ওই যে বললাম, তাদের কোনো অভিযোগ নেই। তারা ওখানে পৌঁছতে পেরেছেন, এটাই অনেক। অনেকের মাথার ওপর প্যান্ডেলের তাঁবু, সেই তাঁবু থেকে আবার রাতে হিম-শিশির পড়ছে, তাই নিজেরাই আবার পলিথিন টাঙিয়ে থাকছেন কয়েক লক্ষ মানুষ। কারো মাথার উপর তো তাঁবু আছে, অনেকেই আবার রাতে খোলা আকাশের নীচেই থাকছেন।
প্রতিবেশী অমুসলিমদের ভূমিকা আরও প্রশংসনীয়। জমি থেকে শুরু করে সব কিছু দিয়ে তারা এগিয়ে এসেছেন। তাদের একটাই বক্তব্যে, এখানে তো পুণ্যের কাজ হবে, এতে ভগবান তার মঙ্গল করবেন, সর্বোপরি তারা যে মানুষের সেবা করতে পারছেন, এটাই বড় প্রাপ্তি। এই তাবলিগি ইজতেমায় অমুসলিমদের ভূমিকা দেখে আমার একটা জিনিস খুব মনে পড়ছিল, গোদি মিডিয়ার কথা। তারা যতই হিন্দু-মুসলিম ন্যারেটিভ সেট করুক না কেন, বাংলায় যে উভয় সম্প্রদায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্য বিরাজমান, তা কোনভাবেই ভাঙতে পারবে না। ইজতেমার মাঠের মধ্যেই একটা শনি মন্দির আছে, তাতে কাউকে স্পর্শ করতে দেখলাম না, বা সেটা দেখে হিংসাত্মক মনোভাব কিংবা বিদ্বষী আচরণ করতে দেখলাম না। এই ইজতেমা এক অভূতপূর্ব সম্প্রীতির সাক্ষী হয়ে থাকল। এখানে সবাই দুনিয়ার জীবনকে তুচ্ছ মনে করে, মৃত্যুর পর আখিরাতের উদ্দেশ্যে তারা কাজ করছেন।
অবশ্য কিছু নেগেটিভ দিক আছে। কিন্তু তার তুলনায় পজিটিভ দিক অনেক বেশি। এতবড় আয়োজন। কিছু ত্রুটি তো থাকবেই। এছাড়াও আয়োজনকা মেইন মজমার জায়গায় কাউকে ছবি তুলতে দিচ্ছেন না। এতে একটা পজিটিভ দিক হল, স্টেজে উঠে নেতাদের ভাষণ বা পলিটিক্যাল মঞ্চ বানানো — এটা এড়ানো গেছে। এখান থেকে সবসময় বিশ্বের মানুষের শান্তির কথা বলা হচ্ছে, শান্তি জন্য বার্তা দেওয়া হচ্ছে, শান্তির জন্য দোয়া করা হচ্ছে। সোমবার ৫ জানুয়ারি ভোরে ফজরের নামায শেষ হয় আখেরি দোয়া। এর মাধ্যমে শেষ হয় তাবলিগি ইজতেমা। আবারও কবে এই বাংলায় এতবড় ইজতেমার আয়োজন হবে, তার ঠিক নেই। এ জন্যই মানুষ কাতারে কাতারে লাইন দিয়ে একবারের জন্য হলেও শরীক হতে যাচ্ছেন। কোন মুসলিম সংগঠনও এর বিরোধিতা করেনি। বাংলার সমস্ত ধর্মপ্রেমী মুসলিমরা যাচ্ছেন এই ইজতেমায়।
তবে একটা বিষয় খটকা লাগল, এখানে মানুষ মিডিয়াকে এড়িয়ে চলছেন। এমনিতেই তারা ছবি তোলেন না, তবুও এবার আরও বেশি সিরিয়াস এই বিষয়ে। আল্লাহর কাছে কামনা, এই ইজতেমা বাংলা তথা দেশজুড়ে শান্তি-সম্প্রীতি বয়ে আনুক, সৌভাতৃত্ব ছড়িয়ে দিক সবার মাঝে।








