‘জেনারেশন গ্যাপ’ — সম্পর্কের বোঝাপড়ায় চ্যালেঞ্জিং
নতুন পয়গাম: ‘জেনারেশন গ্যাপ’ বা প্রজন্মের ব্যবধান বলতে দুটি ভিন্ন প্রজন্মের মানুষের মধ্যে চিন্তা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, আচরণ এবং জীবনযাপনের পদ্ধতিতে বিদ্যমান পার্থক্য বোঝায়, যা তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার ভিন্নতার কারণে তৈরি হয়ে থাকে। প্রতিটি প্রজন্মেরই রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। যোগাযোগের ধরন, মূল্যবোধ এবং সমাজকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি প্রজন্মভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। আর এসব পার্থক্য প্রায়শই ভুল বোঝাবুঝি বা সংঘাতের সৃষ্টি করে। বিশেষ করে প্রেম এবং বিয়ের ক্ষেত্রে ‘জেনারেশন গ্যাপ’ চ্যালেঞ্জিং হয়ে আবির্ভূত হয়েছে।
১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে যাদের জন্ম, তাদেরকে জেন-জি বা জেনারেশন জেড বলা হয়। এরা জুমার, ডিজিটাল নেটিভ, আই জেনারেশন ইত্যাদি নামেও পরিচিত। এদের নিজস্ব ভাষা, শব্দভাণ্ডার এবং সামাজিক যোগাযোগের ধরণ রয়েছে, যা আগের প্রজন্মের কাছে অনেক সময় বোধগম্য হয় না। তারা সম্পর্কের মধ্যে অতিরিক্ত স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত স্পেসকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। এই প্রত্যাশা পূরণ না হলে, তারা দ্রুত দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা দেখায়। এদের ধৈর্য বা আপস করার মানসিকতা কম। সেক্ষেত্রে ছোটখাট ভুল বোঝাবুঝি বা সমস্যা দেখা দিলে ‘ছেড়ে দাও’ মনোভাবও প্রকাশ পায়। সোশ্যাল মিডিয়া, পরিবারের প্রত্যাশা এবং পারিপার্শ্বিক চাপও তাদের সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।
জেন-জি প্রজন্ম সাধারণত সবকিছু সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করতে পছন্দ করে এবং সম্পর্কের অনেক দিকেই বিভিন্ন বিকল্প বা অপশন রাখতে ইচ্ছুক থাকে। এই কারণে তাদের সম্পর্কের ধরন আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি প্রদর্শনীমূলক ও বহুমুখী।
অপরদিকে, জেন-এক্স বলতে সেই প্রজন্মকে বোঝায়, যাদের জন্ম ১৯৬৫ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে। এরা স্বাধীনতা, আত্মনির্ভরশীলতা ও বাস্তববাদকে মূল্য দেয় এবং কর্মজীবনের ভারসাম্য ও প্রযুক্তির সাথে অভিযোজন ক্ষমতা রাখে। এরা সরাসরি যোগাযোগ, গোপনীয়তা এবং পারিবারিক মূল্যবোধকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ছোটখাট সমস্যা নিয়ে সহজে বিরক্ত হয় না, বরং বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে চান।
জেন-জি ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স, ফ্রিল্যান্সিং এবং নতুন সুযোগের দিকে আগ্রহী। অপরদিকে, কাজের ধারণা ও ক্যারিয়ারের দিক থেকে জেন-এক্স স্থায়িত্ব পছন্দ করে। পপ কালচারে ভাষা, সংগীত এবং বিনোদনের পছন্দেও তাদের এই দুই জেনারেশনের মধ্যে যথেষ্ট ব্যবধান দেখা যায়। অর্থনৈতিক দিক থেকেও পার্থক্য আছে। জেন-এক্স ভবিষ্যতে সঞ্চয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়, আর জেন-জি নিজের অভিজ্ঞতা এবং শখ পূরণে খরচ করতে পছন্দ করে। এই পার্থক্যগুলো সম্পর্ক এবং পারিবারিক জীবনেও প্রভাব ফেলে।
সম্পর্ক তৈরীতে যা হতে পারে:
এক্স-জেনারদের ধৈর্য এবং পরিকল্পিত দৃষ্টিভঙ্গি কখনো কখনো জেন-জির দ্রুত পরিবর্তনশীল মনোভাবের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না। অপরদিকে, জেন-জি যারা নতুন প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং বা স্টার্টআপ জীবনধারায় অভ্যস্ত, তারা এক্স-জেনারদের স্থিতিশীলতা ও প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি সঠিকভাবে বুঝতে সময় নিতে পারে না।
বয়সের ব্যবধানের কারণে হরমোনাল পরিবর্তন এবং মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ফলে অবিশ্বাস জন্ম নিতে পারে এবং সংসারে অশান্তি তৈরি হয়। যদিও বৈজ্ঞানিকভাবে বিষয়টি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে পূর্ববর্তী প্রজন্মের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যায় এবং তা সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। তাই আবেগ তাড়িত হয়ে দ্রুত সম্পর্ক শুরু করলে অনেক সময় সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে করণীয়:
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, জীবনের লক্ষ্য ও পারিবারিক দায়িত্ব নিয়ে দু’জনের মত জেনে নিতে হবে। বয়সে খুব বেশি পার্থক্য থাকলে একে অপরের মানসিক অবস্থান ও অগ্রাধিকার বুঝে নিতে হবে। সাধারণ সামাজিক ধ্যান-ধারণার চেয়ে উভয়ের মানসিক মিল ও প্রস্তুতির দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। সব শেষে সম্পর্কের স্থিতিশীলতা শুধু বয়সের ওপর না নির্ভর করে; বরং বোঝাপড়া, সম্মান, মূল্যবোধে মিল, জীবনের লক্ষ্যে মিল এবং যোগাযোগের উপর।








