বন্যা কলকাতায়, হত ৯
চার দশক পর হাবুডুবু মহানগর, দিনভর নামেনি জল, ট্রেন-বাস বন্ধ, নিত্যযাত্রীদের হয়রানি, মার খেল পুজোর মুখে শেষ মঙ্গলহাট, জলমগ্ন হাসপাতাল, ভাসছে বইপাড়া
নতুন পয়গাম,
কলকাতা, ২৩ সেপ্টেম্বর: এক রাতের মেঘভাঙা বৃষ্টিতে বন্যা হয়ে গেল কলকাতায়। স্মরণাতীত কালে যা দেখা যায়নি। ১৯৭৮ সালের পর ১৯৮৬ সালে শেষবার এমন পরিস্থিতি হয়েছিল কলকাতায়। অতিবৃষ্টির কারণে কারশেড ডুবে গেলে মঙ্গলবার ট্রেন চলাচলে দিনভর বিঘ্ন ঘটে। বহু মানুষকে দেখা যায় লিলুয়া থেকে হেঁটে রেললাইন ধরে হাওড়া যাচ্ছেন। হাওড়া গিয়েও তারা বিপাকে পড়েন। কারণ, বাস খুবই কম ছিল। মঙ্গলবার শিয়ালদহ ডিভিশনেও একই অবস্থা দেখা যায়। এমনকি স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের চাকা অর্ধেকেরও বেশি ডুবে যায়। পাম্প চালিয়ে জমা জল নামিয়ে ট্রেন পরিষেবা স্বাভাবিক করতে সন্ধ্যা গড়িয়ে যায়। ফলে এদিনের মতো ট্রেন চলাচল শেষমেষ স্বাভাবিক ছন্দে ফেরেনি। তবে মাঝেমধ্যে কিছু স্পেশাল ট্রেন চালানো হয়। যে কারণে, কাজে যেতে না পেরে কাকভেজা হয়ে বাড়ি ফেরেন নিত্যযাত্রীদের একাংশ।
সড়কপথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা বাইক, ট্যাক্সি, বাস সবই একবুক জলে দাঁড়িয়েছিল। বাইকের কেবল লুকিং গ্লাস জলের ওপরে ছিল। ট্যাক্সির ভিতরে জল ঢুকে যায়। পথচারীরা এক কোমর, কোথাও বা এক বুক জলের ওপর দিয়ে হেঁটে গন্তব্যের দিকে যাত্রা করেন। কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়াও এদিন জলে হাবুডুবু খায়। বহু দোকান ও প্রকাশনা সংস্থার অসংখ্য বই নষ্ট হয়ে গেছে। এমনকি হাসপাতাল, নার্সিংহোমের জরুরি স্বাস্থ্য পরিষেবার কাজও বিঘ্নিত হয়। কারণ, সব জায়গাতেই জল ঢুকে গিয়েছে। রিসেপশন থেকে ওটি, ওপিডি, আইসিইউ, ল্যাব সবকিছুই জলে ভাসতে থাকে। কোথাও একহাঁটু, কোথাও এক কোমর। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত পাওয়া খবরে জানা যায়, অন্তত ৯ জনের প্রাণহানি হয়েছে। নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একরাতের বৃষ্টি ছাপিয়ে গেছে আমফানকেও। সোমবার মধ্যরাত থেকে আচমকা হুড়মুড় করে বৃষ্টি রাতভর চলে। মুষল ধারার বৃষ্টি চলে ৬ ঘণ্টা ধরে। মঙ্গলবারও দুপুর পর্যন্ত কমবেশি বৃষ্টি হয়। ফলে ভোররাতেই কলকাতা শহর ডুবে যায়। গত ৪০ বছরে যা হয়নি। কলকাতায় বন্যা বা বানভাসি কলকাতার ছবি এই প্রথম দেখল মাঝবয়সিরা। ৫ বছর আগে আমফানে বিপর্যস্ত হয়েছিল রাজ্যের একাংশ। সেদিন ২৩৬.৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল কলকাতায়। আর সোমবার বৃষ্টি হয় ২৫১.৪ মিমি.। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, এই প্রবল বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস ছিল না। তাই আচমকা অতিবর্ষণে ডুবে গিয়েছে কলকাতা। মেয়র ফিরহাদ হাকিমকেও দেখা গেছে এক বুক জলে নেমে তদারক করছেন।
আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য মতে, কলকাতা মহানগরে ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে এমন বৃষ্টি হয়েছিল। বরং এর থেকেও বেশি বৃষ্টি হয়েছিল ৪৭ বছর আগের ২৮ সেপ্টেম্বর। সেদিন বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ৩৬৯.৬ মিমি.। এরপর ১৯৮৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর হয়েছিল ২৫৯.৫ মিমি. বৃষ্টি। সেই তুলনায় এদিনের বৃষ্টির পরিমাণ একটু কম ছিল।
বৃহত্তর কলকাতা শহর এদিন জলবন্দি থাকার কারণ সময়মতো জল নামানো যায়নি। তাছাড়া এদিন অতিবৃষ্টির দরুণ গঙ্গায় ভরা জোয়ার ছিল। অগত্যা শ্যামবাজার থেকে উল্টোডাঙা, পার্ক সার্কাস থেকে বালিগঞ্জ, রাসবিহারী থেকে নিউ আলিপুর, পাটুলি থেকে বেহালা — সর্বত্র একই জল-ছবি। বাদ যায়নি শহরের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলিও। শিল্পতালুক সেক্টর ফাইভের অবস্থাও ছিল একই। নিত্যযাত্রী বা অফিসযাত্রীরা চূড়ান্ত দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। সকালের দিকে কিছু বাস, ট্যাক্সি বেরলেও মাঝপথেই সেগুলি থেমে যেতে বাধ্য হয়। বহু জায়গায় দেখা যায় বিকল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাস, ট্যাক্সি, অ্যাপ ক্যাব, বাইক। ট্রেন-মেট্রো পরিষেবাও ব্যাহত হয়। হাওড়া-শিয়ালদহ শাখায় বহু লোকাল ট্রেন এবং প্রায় ৪০টি এক্সপ্রেস ট্রেন বাতিল করতে হয়।
একেবারে পুজোর মুখে এসে এই দুর্যোগ নিয়ে রাজনীতিও শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত। এবার পুজোর শেষলগ্নের বিকিকিনি বড় রকমের মার খেল। জলের কারণে এদিন হাওড়া মঙ্গলহাটও কার্যত বন্ধ ছিল। দোকানদাররা বেশিরভাগই আসতেই পারেনি। রাজ্যের অন্যতম বড় জামা-কাপড়ের এই হোলসেল মার্কেটের এদিন ছিল পুজোর আগে শেষ হাট। সব মিলিয়ে পুজোর বাজার পণ্ড করতে এবার অসুরের তকমা পেল বৃষ্টি।








