অশ্বডিম্ব প্রসব পুতিন-ট্রাম্প বৈঠকে, তিন বছরের যুদ্ধ থামাতে ব্যর্থ তিন ঘণ্টার মিটিং
নতুন পয়গাম, আলাস্কা: শেষ হয়েও হইল না শেষ। টানা তিন ঘণ্টা চলল রুদ্ধদ্বার বৈঠক। শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে দীর্ঘ প্রায় ৯০ মিনিটের মুখোমুখি আলোচনাতেও রাশিয়া বনাম ইউক্রেন যুদ্ধে বিরতির লক্ষ্যে কোন চুক্তি হল না। জটও কাটল না। যদিও ট্রাম্প বরাবরের মতোই এই বৈঠককেও ‘অত্যন্ত চমৎকার’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে এদিন আমেরিকার আলাস্কায় এই বৈঠকই শেষ নয়। দ্বিতীয় দফায় আবার অন্য কোথাও দুজনে একান্তে বৈঠকে মিলিত হবেন বলে হোয়াইট হাউস সূত্রে খবর।
এদিন বৈঠক শেষে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘অনেক বিষয়েই আমরা একমত হয়েছি। তবে সবথেকে বেশি যে দুটি বিষয়ের ওপর আমরা নজর রেখেছিলাম, তার সমাধান মেলেনি। কিন্তু কিছুটা এগোনো গিয়েছে। বলা যায়, ততক্ষণ চুক্তি হবে না, যতক্ষণ আমরা ঐক্যমত্যে পৌঁছাই। তবে কয়েকটা বিষয় বাকি আছে। তার মধ্যে কিছু অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল একটাই। আর তার সমাধান হওয়ার খুব ভাল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেটা এখনও করতে পারিনি।”
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে প্রথম বার প্রেসিডেন্ট হয়ে ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উনের সঙ্গে সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামে দুই দফায় বৈঠক করেও সমঝোতা হয়নি। কিমের দেশ উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্র মুক্ত করানোর চুক্তিতে শেষমেষ সই করাতে ব্যর্থ হন ট্রাম্প। সেই বৈঠকের আগে কিমকে হুমকি দিয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, আমার কথা শুনলে সমঝোতা করলে পিয়ংইয়ং মালামাল হয়ে যাবে। নাহলে গাদ্দাফির মতো গর্দান যাবে। কিন্তু এমন প্রাণঘাতী হুমকি দিয়েও কিম জং-এর জং ছাড়াতে পারেননি ট্রাম্প। কারণ, কিমের কূটনৈতিক অভিভাবক হল চীন ও রাশিয়া। ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের আগে দুবারই পুতিন ও জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রায়াল দিয়ে নিয়েছিলেন কিম। তাতেই গর্দান শক্ত হয় কিমের। তাই ট্রাম্প সেবার কিমের মাথা নোয়াতে পারেননি। যদিও উভয় বৈঠকের পরেই ট্রাম্প স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলেছিলেন, বিশ্ববাসী এবার নিশ্চিন্তে ঘুমাবে। আর কোন চিন্তা নেই। উত্তর কোরিয়ার পরমা্ণু অস্ত্রে লাগাম পরানোর ব্যবস্থা নাকি তিনি করে ফেলেছেন।
কিন্তু পরে জানা যায়, ছাইয়ের মাথা। চুক্তির ব্যাপারে কিমের মাথা নোয়াতে পারেননি ট্রাম্প। কিম রীতিমতো কিং হয়েই ট্রাম্পের সামনে পাদুকা পুরাণ দুলিয়েছেন। এই স্পর্ধা দেখে অবাক হয়ে যান ট্রাম্প। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন হল, ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তিতে সই করেছিল ইরান এবং নিরাপত্তা পরিষদের ৫ স্থায়ী সদস্য দেশ। আমেরিকা, ব্রিটেন, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স ছাড়াই সই করেছিল জার্মানি, রাষ্ট্রসংঘের অধীনস্ত আন্তর্জাতিক পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ সংস্থা আইএইএ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কিন্তু প্রথমবার মসনদে বসে সেই চুক্তি ছেড়ে একতরফা বেরিয়ে যান ট্রাম্প। আজো সেই চুক্তি বিকল হয়ে পড়ে আছে ট্রাম্পের জিদ ও হঠকারিতার কারণে।
যাহোক, এদিন বিশ্বজুড়ে ট্রাম্পের শুল্ক-বাণ নিয়ে যে পরিস্থিতি, তাতে যুযুধান দু’পক্ষ ট্রাম্প-পুতিনের এই বৈঠক যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা নিয়ে সংশয়ের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। বৈঠক থেকে বহু দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধানের আশা ছিল। তার মধ্যে প্রধান অবশ্যই রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধে স্থায়ীভাবে ছেদ টানা। কিন্তু সবথেকে আশ্চর্যজনক ঘটনা হল, এদিনের বৈঠকে ইউক্রেনকে ডাকাই হয়নি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে আমন্ত্রণ না জানানোয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন যথেষ্ট আপত্তি করেছে। বিবদমান দু’দেশের মধ্যে যখন যুদ্ধবিরতি নিয়েই আলোচনা, তখন একপক্ষকে অন্ধকারে রেখে কীভাবে সিদ্ধান্ত হবে?
ট্রাম্প বার বার দাবি করেছেন, ২০২২ সালে ক্ষমতায় থাকলে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে তিনি যুদ্ধ হতেই দিতেন না। শুক্রবারের সাংবাদিক বৈঠকে কার্যত সেই দাবিকেই মান্যতা দিলেন পুতিন। তাছাড়া এবার ২০ জানুয়ারি ২০২৫ শপথ নিয়েই ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি যুদ্ধ বন্ধ করবেন। কিন্তু এখনও সমানে চলছে গাজায় একবগ্গা ইসরাইলি যুদ্ধ এবং অন্যদিকে রাশিয়া বনাম ইউক্রেন যুদ্ধ। ইদানীং আবার নতুন করে শুরু হয়েছে কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ। গাজায় যুদ্ধ অত সহজে থামবেও না। কারণ, ইসরাইলকে রীতিমতো অস্ত্র ও অর্থ সাহায্য দিয়ে চলেছে আমেরিকা। পুতিন তো ট্রাম্পের ‘ঘরেলু আদমি’ এবং ‘কাছের মানুষ, কাজের মানুষ’। তাই তো গতবার অরাজনৈতিক ধনকুবের ট্রাম্প কীভাবে নির্বাচনে জিতেছিলেন, তার পিছনে আজো রহস্য লুকিয়ে আছে। পুতিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সাইবার হ্যাক করে নাকি সেবার ট্রাম্পকে জিতিয়ে দিয়ে হোয়াইট হাউসের চাবিকাঠি তুলে দিয়েছিলেন। সেই নিয়ে মার্কিন মুলুকে অনেক জলঘোলা হয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প কিংবা পুতিন কারো সাজা হয়নি। ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন। থাইল্যান্ড বনাম কম্বোডিয়া সংঘর্ষের নেপথ্যে রয়েছে আমেরিকা ও চীনের দড়ি টানাটানি। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এই দুটি ছোট দেশকে কে পকেটে পুরে রাখবে, সেই নিয়ে কার্যত ট্র্যাপিজের খেলা চলছে ট্রাম্প ও জিনপিংয়ের মধ্যে। সুতরাং যুদ্ধ থামার কোন লক্ষণ নেই, কারণও নেই। মাঝখান থেকে অস্ত্রের সওদাগর পশ্চিমা দেশগুলো বিপুল মুনাফা করছে।








