চাপে পড়ে চণ্ডীগড় নিয়ে রণে ভঙ্গ বিল আসছে না শীতকালীন অধিবেশনে
পাঞ্জাবে সব দল এককাট্টা পিছু হটল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক
নতুন পয়গাম, নয়াদিল্লি:
চণ্ডীগড়কে পাঞ্জাব থেকে আলাদা করার পরিকল্পনা আপাতত ভেস্তে গেল। তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে এ ব্যাপারে পিছু হটতে বাধ্য হল কেন্দ্র সরকার। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বলেছে, বিষয়টি বিবেচনাধীন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। যদিও সূত্রের খবর, সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে চণ্ডীগড়কে আলাদা করার লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনী বিল তালিকায় রেখেছিল কেন্দ্র সরকার। কিন্তু সেই গোপন এজেন্ডা প্রকাশ হতেই বিরোধী দলগুলি তীব্র প্রতিবাদ জানায়। স্বরাজ্যের অস্মিতার কথা ভেবে পরিস্থিতির চাপে বিরোধিতা করতে হয় পাঞ্জাবের বিজেপি নেতাদেরকেও। উল্লেখ্য, ১৯৮৪ সালের ১ জুন থেকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল চণ্ডীগড়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব পাঞ্জাবের রাজ্যপালের। তার আগে কেন্দ্র নিযুক্ত স্বাধীন মুখ্যসচিবের অধীনে ছিল চণ্ডীগড়। আগের সেই ব্যবস্থা মোদি ক্ষমতায় আসার পর ২০১৬ সালে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল। সেবারও প্রবল প্রতিবাদের জেরে পিছিয়ে যেতে হয়েছিল কেন্দ্র সরকারকে।
জানা গিয়েছে, আসন্ন শীতকালীন অধিবেশনে চণ্ডীগড়ের আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য সংবিধানের ১৩১ তম সংশোধনী বিল সংসদে আলোচনার তালিকায় রাখা হয়েছিল। ১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে শীতকালীন অধিবেশন। সংবিধানের ২৪০ ধারা প্রয়োগের প্রস্তাব রয়েছে বিলে। আন্দামান ও নিকোবর, লাক্ষ্মাদ্বীপ, দাদরা ও নগর হাভেলি, দমন ও দিউতে সংবিধানের এই ধারা অনুযায়ী প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্ব থাকে মূলত রাষ্ট্রপতির অধীনে। পুদুচেরিতে বিধানসভা না থাকলে এই ধারা প্রয়োগ করা হয়। বিলের বয়ান প্রকাশ্যে চলে আসতেই দলমত নির্বিশেষে পাঞ্জাবের প্রায় সব রাজনৈতিক শিবির তীব্র প্রতিবাদে নামে। পাঞ্জাবের আম আদমি পার্টির মুখ্যমন্ত্রী ভগওয়ান্ত মান বলেন, ‘গভীর চক্রান্ত ও অবিচারের শিকার হচ্ছে পাঞ্জাব। বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার পাঞ্জাবের রাজধানীকে কেড়ে নিতে চাইছে।’’ এর তীব্র প্রতিবাদ করে শিরোমনি আকালি দল এবং কংগ্রেস।

এমনকি পাঞ্জাবের বিজেপি নেতারাও বিরোধিতায় সোচ্চার হন। এরপর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হয়, চণ্ডীগড় সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন বিবেচনায় রয়েছে মাত্র, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। চণ্ডীগড়ের প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের কথা আপাতত ভাবা হচ্ছে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ডিগবাজি খেয়ো এও বলেছে, শীতকালীন অধিবেশনে এই সংক্রান্ত বিল পেশ হচ্ছে না। তবে কেন্দ্রের এসব কথায় বিশ্বাস করতে পারছে না পাঞ্জাব ও চণ্ডীগড়ের সাধারণ মানুষ থেকে জনপ্রতিনিধিরা। তারা পুরো বিষয়টিকে অভিসন্ধিমূলক বলে অভিহিত করেছে এবং কেন্দ্রের মতলব সম্পর্কে সংশয়ে রয়েছে।
তাদের অভিযোগ, ২৪০ ধারা প্রয়োগ করে চণ্ডীগড়কে পাঞ্জাব থেকে পৃথক করা হলে সরাসরি চণ্ডীগড় প্রশাসনের কোন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি হস্তক্ষেপ করতে পারবেন। কিন্তু পর্দার আড়াল থেকে বকলমে তা নিয়ন্ত্রণ করবে কেন্দ্রীয় সরকারই। লোকসভা এবং রাজ্যসভার বুলেটিনে বলা হয়েছিল, সংবিধানের ১৩১তম সংশোধনী বিল ২০২৫ সংসদের আসন্ন শীতকালীন অধিবেশনে পেশ করা হবে, যা ১ ডিসেম্বর, ২০২৫ থেকে শুরু হবে।
বিলটিতে চণ্ডীগড় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে ২৪০ অনুচ্ছেদে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়। চণ্ডীগড় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে একটি স্বাধীন প্রশাসকের দরজা খুলে যাবে, যেমন অতীতে এর একজন স্বাধীন মুখ্য সচিব ছিলেন। এই বিলটি আনার পদক্ষেপ কংগ্রেস, আকালি দল এবং আপের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মান বলেন, ‘বিজেপি সরকার পাঞ্জাবের রাজধানী ছিনিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে, এটি একটি গুরুতর অন্যায়। চণ্ডীগড় ছিল, আছে এবং সর্বদা পাঞ্জাব রাজ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই থাকবে। মূল রাজ্য হিসেবে পাঞ্জাবের রাজধানী চণ্ডীগড়ের উপর একমাত্র অধিকার রয়েছে, তা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। পাঞ্জাব প্রদেশে কংগ্রেস সভাপতি অমরিন্দর সিং রাজা একে সম্পূর্ণ অযাচিত বলেন এবং পাঞ্জাব থেকে চণ্ডীগড় ছিনিয়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে রাজ্যবাসীকে সতর্ক করে
বলেছেন, ‘চণ্ডীগড় পাঞ্জাবের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এটি ছিনিয়ে নেওয়ার যে কোন প্রচেষ্টার গুরুতর প্রতিক্রিয়া হবে।’ শিরোমণি আকালি দলের সভাপতি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সুখবীর সিং বাদল বলেছেন, বিলটি চণ্ডীগড়কে পাঞ্জাবের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিশ্রুতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হবে। তাই প্রস্তাবিত বিল ও আইনকে পাঞ্জাবের অধিকারের উপর আক্রমণ হিসাবে বর্ণনা করে সুখবীর বাদল বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো-বিরুদ্ধ।
পাঞ্জাব ও চণ্ডীগড়ের ইতিহাস
১৯৬৬ সালে পাঞ্জাব পুনর্গঠনের পর, চণ্ডীগড়কে পাঞ্জাব ও হরিয়ানার রাজধানী করা হয়েছিল। পরবর্তীতে একাধিক চুক্তির অধীনে কেন্দ্র চণ্ডীগড়কে পাঞ্জাবের রাজধানী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। পাঞ্জাবের রাজ্যপাল বর্তমানে চণ্ডীগড় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মুখ্য প্রশাসক। ১৯৬৬ সালের ১ নভেম্বর যখন পাঞ্জাব পুনর্গঠিত হয়েছিল, তখন থেকে এটি স্বাধীনভাবে মুখ্য সচিব দ্বারা পরিচালিত হত। ১৯৮৪ সালের ১ জুন থেকে চণ্ডীগড় পাঞ্জাবের রাজ্যপাল দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে এবং মুখ্যসচিবের পদটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল প্রশাসকের উপদেষ্টা হিসেবে রূপান্তরিত হয়। ২০১৬ সালের আগস্টে কেন্দ্র প্রাক্তন আইএএস অফিসার কে.জে আলফোনসকে শীর্ষ পদে নিয়োগ করে স্বাধীন প্রশাসক থাকার পুরনো রীতি পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করেছিল। তৎকালীন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ সিং বাদল এনডিএ-র শরিক ছিলেন এবং কংগ্রেস, আপ-সহ অন্যান্য দলগুলির তীব্র বিরোধিতার পর এই পদক্ষেপ প্রত্যাহার করা হয়।
চণ্ডীগড় হল পাঞ্জাব এবং হরিয়ানা উভয় রাজ্যেরই যৌথ রাজধানী। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে ৩৭০ ধারা বিলোপ করে জম্মু কাশ্মীরকে ভেঙে টুকরো করে তিনটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে পরিণত করে নরেন্দ্র মোদী সরকার। তাই পাঞ্জাব এখন জম্মু কাশ্মীর থেকে শিক্ষা নিয়ে সাবধান হয়েছে। কাশ্মীরের পুনরাবৃত্তি যেন পাঞ্জাবেও না হয়, সেটা ঠেকাতে তারা দলমত নির্বিশেষে এককাট্টা।








