৩৫ লক্ষ কোটি টাকার কর্পোরেট কর মকুব
নতুন পয়গাম, কলকাত: রবিবার ১ ফেব্রুয়ারি সংসদে পেশ হল পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় বাজেট। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ফের আয়করে ছাড় দেন কি না, তা জানতে মুখিয়ে ছিল সাধারণ মানুষ। ঠিক তার আগে সামনে আসছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। সেটা হল সবকা সাথ সবকা বিকাশের স্লোগান দেওয়া নরেন্দ্র মোদি সরকার ‘বন্ধু কর্পোরেট’দের দেদার কর মুকুব করে চলেছে। এবার সেই বকেয়া কর মকুবের পরিমাণ প্রায় ৩৫ লক্ষ কোটি টাকা, যা চোখ কপালে উঠে যাওয়ার মতো নয় কি?
৫৮৮ কোটি টাকার কর বকেয়া রাখার অভিযোগে দেশের প্রথম সারির এক সিমেন্ট কোম্পানিকে নোটিস ধরিয়েছিল ইনকাম ট্যাক্স দপ্তর। প্রায় তিন মাসের আইনি লড়াইয়ের পর সেই অঙ্কটা নেমে আসে ২২২ কোটিতে। চলতি অর্থবর্ষে এমন উদাহরণ মাত্র একটা নয়। কোনও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদক সংস্থার বকেয়া কর ১১০ কোটি থেকে নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে, আবার এক বেসরকারি বড় হাসপাতাল গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রায় ৯০ কোটি টাকার বকেয়া কর সংশোধনের পর এসে দাঁড়িয়েছে শূন্যে। এমন ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে। এমনও দেখা গিয়েছে, বকেয়া কর আদায়ের মতো সম্পত্তিও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছে নেই। আর এই সবের সুবাদে হিসাবের খাতা থেকে কোটি কোটি টাকার ‘আউটস্ট্যান্ডিং ট্যাক্স’ ছেঁটে ফেলতে বাধ্য হয়েছে আয়কর দপ্তর।
সরকারি পরিসংখ্যানেই প্রকাশ, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের গোড়ায় আয়কর আদায় বকেয়া ছিল প্রায় ৪৮ লক্ষ কোটি টাকার। প্রায় পুরোটাই কর্পোরেট শিবির থেকে উশুল করার কথা ছিল। তার সিংহভাগই যে আর কোষাগারে আনা যাবে না, ইতিমধ্যেই বুঝে গিয়েছে কেন্দ্র। অর্থ বিষয়ক সংসদীয় কমিটির রিপোর্ট বলছে, অর্থমন্ত্রক বাধ্য হয়ে সেই বিপুল অঙ্কের বকেয়া নামিয়ে এনেছে প্রায় সাড়ে ১৩ লক্ষ কোটি টাকায়। বাকিটা আর হিসাবের খাতায় রাখাই হচ্ছে না। খেরো খাতা লাটে তুলে দেওয়া হচ্ছে। বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছে, এর মাঝে নিশ্চিত কিছু গোপন লেনদেন আছে। নাহলে এত বিপুল পরিমাণ বকেয়া কর মুকুব করার প্রয়োজন কোথায়!
উল্লেখ্য, চলতি অর্থবর্ষের জন্য মাথাপিছু বার্ষিক ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ে করছাড় দেওয়া হয়েছিল গত বছর বাজেটে। সরকারের হিসাব ছিল, এর জন্য প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা কম আসতে চলেছে রাজকোষে। তাই কার্যত মরিয়া হয়ে ‘সোর্স’ বাড়ানোর দিকে মন দেয় অর্থমন্ত্রক। দেখা যায়, কর্পোরেট সংস্থাগুলির কাছ থেকে আদায় না হওয়া আয়কর, তার উপর সুদ, জরিমানা ইত্যাদি মিলিয়ে বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৪৮.১৮ লক্ষ কোটি টাকা! তা সরকারের ঘরে আনতে আঞ্চলিক অফিসগুলিকে রীতিমতো টার্গেট বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু আইনি মারপ্যাঁচে অধিকাংশ ট্যাক্স নোটিসই গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। সংসদীয় কমিটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘ আইনি লড়াই চলাকালীন বহু সংস্থাই উঠে গিয়েছে। এছাড়া অনেক কোম্পানির বহু সম্পত্তি ইতিমধ্যে ইডি-সিবিআইয়ের মতো এজেন্সির দখলে। সেগুলি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা কম।
আবার অনেক কোম্পানি কাগজে কলমে ‘ভুয়ো’ সম্পত্তি দেখিয়েছে বলেও অভিযোগ। এমনকি, বহু ক্ষেত্রে একই আয়কর সংক্রান্ত ফাইল দু’বার করে হিসাবের মধ্যে ধরা হয়েছে। তাই এখন সব কাটছাঁট করে আয়কর বিভাগ মনে করছে, ১৩ লক্ষ ৪৮ কোটি টাকা হয়তো আদায় হলেও হতে পারে। বাকি ৩৪ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি টাকা সরকারের বোঝা ছাড়া কিছুই নয়। শুধু পশ্চিমবঙ্গকেই ৪৯ হাজার কোটি টাকা হিসাবের খাতা থেকে সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদায় করতে হবে ২৫ হাজার কোটি টাকার বকেয়া কর। কেন্দ্র সরকারের এই কর্পোরেট-বান্ধব অর্থনীতির নেপথ্যে কি কৌটিল্য, নাকি চাণক্য — কার লম্বা হাত রয়েছে, সেটাই এখন দেখার।








