বড়বিল: কচুরিপানায় ঢাকা জীবনের অন্ত্যেষ্টি
সামিমা খাতুন, ডোমকল, নতুন পয়গাম: জলাশয় যখন শুধুই জল থাকে না, হয়ে ওঠে জীবন, স্মৃতি, আশ্রয় — তখন তার মৃত্যু একক নয়, হাজারো জীবনের একসঙ্গে শেষ হয়ে যাওয়ার আর্তনাদ।
মুর্শিদাবাদের জলঙ্গি ব্লকের বুকে এক সময় যে বড়বিল জেগে ছিল, আজ তার বুকজুড়ে শুধুই স্তব্ধতা। কচুরিপানার সবুজ চাদরে মোড়া সেই জল যেন সময়ের কাছে মাথা নত করে ফিসফিসিয়ে বলে — “আমি আর নেই…!”
যে বিলে বাস করত গ্রাম, আজ সেখানেই বাস শুধুই কষ্ট। ঘোষপাড়া, খয়রামারী, সাদিখানদেয়ার, রওশননগর, সীতানগর, এনায়েতপুর — এমন আট-দশটি গ্রামের মানুষের প্রাণ ছিল এই বড়বিল। ধান, পাট, শাক-সবজি একরকম কৃষি-অর্থনীতি দাঁড়িয়ে ছিল এই বিলের জলের উপর।
৪ হাজার বিঘা জমির ফসল বা শস্য ফলত এই বড়বিলের স্বাদু জল আর নিকাশির উপর ভর করেই। কিন্তু এখন? পদ্মায় সুইচগেট বসানোয় বর্ষার জল ঢোকে না, জল জমে থেকে যায়, আর সেই জলে জন্ম নেয় কচুরিপানার দানবীয় রাজত্ব।
নিকাশির পথ, ক্যানেল সব মৃতপ্রায়। যে জল একসময় বাঁচাত, আজ তা-ই শ্বাসরোধ করে।
নৌকোয় করে যাওয়া বিয়ের বর, আজ বাইকে পরিযায়ী শ্রমিক। একসময় এই বিলে ভাসত নৌকা, আর তার উপরে বসে চলত বিয়ের বরযাত্রী। ছেলে-মেয়েরা যেত স্কুলে, পাড়ার মানুষ স্নানে, তরুণেরা যেত মাছ ধরতে। আর আজ? কচুরিপানা জমে নৌকা চলাচলের রাস্তা বন্ধ। এখন কেউ আর নৌকায় চড়ে না।
এলাকার অনেকেই এখন মুম্বই, কেরালা, এমনকি দুবাই পর্যন্ত চলে গেছে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে। যেখানে একসময় বড়বিল ছিল জীবন-জীবিকার ঠিকানা, আজ সেখানে একমাত্র ঠিকানা ভিন রাজ্যের ঘাম ঝরানো শ্রম।
মাছের গল্প এখন শুধু গল্পেই আছে। বড়বিল মানেই একসময় বোয়াল, কাতলা, শোল, পুঁটি, ট্যাংরা আর জিওলের সমাহার। এখন সেখানে মাছ নেই। আছে কেবল কচুরিপানা, আর আছে জাল ছিঁড়ে যাওয়া স্বপ্ন। জনৈক মৎস্যজীবী বলেন, “জাল ফেলে ১০০ টাকার মাছ পেলে খুশি হতাম, এখন তো কচুরিপানা এসে জাল ছিঁড়ে দিয়ে যায়। শূন্য হাতে ফিরতে হয়।”
যে বিল এক করত, আজ সে ভাগ করে দেয়। একসময় সবাই মিলে বাঁচত এই বিল ঘিরে। কেউ মাছ ধরত, কেউ চাষ করত। আজ সেখানে কাটা পুকুরে চলছে ব্যক্তিগত মাছ চাষ। যার জমি নেই, তার ভাগেও কিছু পড়ে না।
একসাথে বাঁচার শিক্ষা দেওয়া বড়বিল আজ বিভাজনের প্রতীক। পিচঢালা রাস্তায় হাঁটে আধুনিকতা, কিন্তু মন পড়ে আছে কাদামাখা ছেলেবেলায়। গ্রামের কাদা রাস্তা, গামছা পরে স্কুলে যাওয়া, রাস্তার ধারে বসে বই পড়া — সব কিছু আজ স্মৃতি। আজ আছে পিচের রাস্তা, বাইক, ইন্টারনেট, পাকা স্কুলবাড়ি। তবু বড়বিলের সেই নরম কাদার টান মানুষ আজো ভুলতে পারে না।
যেমন মন ভোলে না প্রথম প্রেম, প্রথম হারানো দিনগুলো। শেষ নিঃশ্বাস? নাকি নীরব প্রতিবাদ?
আজ বড়বিল নিঃশব্দ। তার বুক জুড়ে কেবল কচুরিপানা। কিন্তু এই নিস্তব্ধতা নিছক নির্লিপ্ত নয়, এ এক জলের অন্ত্যেষ্টি, যেখানে প্রতিটি ঢেউ যেন কান্না চেপে বসে আছে। প্রশাসনের দৃষ্টি কবে পড়বে?
গ্রামের মানুষ বলছেন, “একবার যদি নিকাশি খালগুলো খনন হয়, সুইচগেট খোলা যায় — তবে বিল আবার প্রাণ ফিরে পাবে, তার হারানো গৌরব-গরিমা ফিরবে। মাছ আসবে, চাষ হবে, মানুষ ফিরবে পুরনো ছন্দে।”








