অপসংস্কৃতির স্রোতের বিপরীতে নাট্যচর্চার বার্তা – বাগনানে তিনদিনের নাট্য উৎসবে নজর কাড়ল বাঙালপুর বয়েজ ক্লাব
নতুন পয়গাম, অভিজিৎ হাজরা, বাগনান, হাওড়া: বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের ভিড়ে যখন শিশু ও যুবসমাজ ক্রমশ মোবাইলনির্ভর হয়ে পড়ছে, তখন সুস্থ সংস্কৃতির চর্চার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে সঠিক পথে ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে বাঙালপুর বয়েজ ক্লাব। বাগনান থানার অন্তর্গত এই ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের উদ্যোগে তিনদিনব্যাপী ২৪তম নাট্য উৎসব ও দ্বিতীয় বর্ষ স্কুলভিত্তিক নাট্য প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হল হাওড়া জেলার বাঙালপুর সিংহবাহিনী তলায় ক্লাব প্রাঙ্গণে।
আয়োজকদের বক্তব্য, সমাজে বর্তমানে একদিকে সুস্থ সংস্কৃতি, অন্যদিকে অপসংস্কৃতির প্রবল স্রোত বইছে। সহজলভ্য স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের প্রভাবে অনেক তরুণ-তরুণী নিজেদের সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের সুযোগ হারাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নাট্যচর্চাকে হাতিয়ার করে তাদের সুস্থ সাংস্কৃতিক ধারায় ফেরানোর লক্ষ্যেই এই উৎসবের আয়োজন।
ক্লাবের সম্পাদক তপন ঘোষ জানান, ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাব সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রায় ২৬ বছর আগে এলাকার মানুষের সাংস্কৃতিক বিকাশের উদ্দেশ্যে নাট্য উৎসবের সূচনা হয়। করোনাকালে দু’বছর বন্ধ থাকায় এবার উৎসবের ২৪তম বর্ষ পালিত হল। ২০২৫ সাল থেকে নতুন উদ্যোগ হিসেবে স্কুলভিত্তিক নাট্য প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছে, যাতে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অভিনয় ও নাটকের প্রতি আগ্রহ বাড়ে।
ক্লাব সভাপতি সমাজসেবী গোপাল ঘোষ বলেন, রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন “থিয়েটারে লোকশিক্ষা হয়”—এই দর্শন থেকেই নাট্যচর্চাকে সামাজিক শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরতে চায় ক্লাব। তাঁর মতে, যাত্রা, বাউল, কবিগান, পালাগানসহ লোকসংস্কৃতির নানা ধারা আজ বিলুপ্তির পথে; সেই ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
তিনদিনের উৎসবে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের ছয়টি নাট্যদল প্রদর্শনীমূলক নাটক মঞ্চস্থ করে। পাশাপাশি বাগনান এলাকার তিনটি বিদ্যালয় নাট্য প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে ভুঁঞেড়া বি এন এস হাই স্কুলের প্রযোজনা “ইঁদারায় গন্ডগোল”, দ্বিতীয় হয় বাঙালপুর ইউ সি হাই স্কুলের “গৌ গাবৌ গাবঃ” এবং তৃতীয় স্থান পায় মুগকল্যাণ হাই স্কুলের “অথ স্বর্গ বিচিত্রা”। শ্রেষ্ঠ নির্দেশক, অভিনেতা ও পার্শ্বচরিত্র অভিনয়ের পুরস্কারও প্রদান করা হয়।
ক্লাবের কার্যকরী সদস্য দীপঙ্কর ঘোষ বলেন, “শুধু পড়াশোনা নয়, শিশুদের সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য সাংস্কৃতিক চর্চা অপরিহার্য। থিয়েটার একটি জীবন্ত শিল্প- এটি কখনও মোবাইলের পর্দায় সীমাবদ্ধ করা যায় না।” আগামী বছর নাট্য উৎসবের রজতজয়ন্তী বর্ষ উপলক্ষে আরও বড় আয়োজনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনদিনের এই অনুষ্ঠান এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষেরা আয়োজকদের উদ্যোগের প্রশংসা করে জানিয়েছেন, এ ধরনের অনুষ্ঠান নিয়মিত হলে নতুন প্রজন্ম সুস্থ সংস্কৃতির পথে আরও উৎসাহিত হবে।








