জঙ্গলের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বনবিবি ও তাঁর লোককথা
হাসান লস্কর বাবলু, সুন্দরবন, দক্ষিণ ২৪ পরগনা:
বাংলার লোকবিশ্বাসে বনবিবি সুন্দরবনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী — বনের রক্ষাকর্ত্রী, জীবিকার ভরসা, আর ভয়ঙ্কর প্রকৃতির মধ্যেও মানুষের আস্থার প্রতীক। ধর্ম, জাতি বা সম্প্রদায়ের সীমা ছাড়িয়ে তিনি পূজিতা হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই। সুন্দরবনের মধু সংগ্রহকারী, কাঠুরে, মৎস্যজীবী — সকলেই বনের কাজে বের হওয়ার আগে বনবিবির নাম উচ্চারণ করে তাঁর আশীর্বাদ কামনা করেন।
বনবিবির জন্মকথা
লোককথা অনুযায়ী, বহু বছর আগে দক্ষিণ ভারতে এক ফকির ইব্রাহিম ও তাঁর স্ত্রী গুলন বেগমের ঘরে জন্ম হয় বনবিবির। গুলন বেগম গর্ভবতী অবস্থায় জঙ্গলে একা পড়ে যান, আর তখনই—বিশ্বাস করা হয়—আল্লাহ তাঁর জন্য এক প্রাসাদ তৈরি করে দেন। সেই অলৌকিক পরিবেশেই জন্ম নেন বনবিবি ও তাঁর যমজ ভাই শাহ জাঙ্গুলী, যিনি পরবর্তীতে বনদেবতা হিসেবে পূজিত হন।
দেবীর মাহাত্ম্য ও পূজা-পদ্ধতি
সুন্দরবনের মানুষ বিশ্বাস করেন, বনবিবির আশীর্বাদে তাঁরা বাঘ, কুমির ও সাপের মতো বিপজ্জনক প্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পান। তাই বনে প্রবেশের আগে তাঁর পূজা করা এক চিরাচরিত প্রথা।
এই পূজায় সাধারণত কোনো মূর্তি ব্যবহার করা হয় না। একটি খোলা জায়গায় ‘বনবিবির থান’ তৈরি করে পূজা করা হয়। পূজায় অংশ নেন হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ, যা সুন্দরবনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
বনবিবি, দক্ষিণরায় ও কালুরায়
সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলে বনবিবি পূজিত হন বিভিন্ন নামে—বনদেবী, বনদুর্গা, ব্যাঘ্রদেবী, বনচণ্ডী ইত্যাদি। কোথাও তিনি দক্ষিণরায় (বাঘদেবতা) ও কালুরায়-এর সঙ্গে একত্রে পূজিত হন। বনবিবির বাহন কখনও বাঘ, কখনও মুরগি, অঞ্চলভেদে প্রচলিত বিশ্বাসে ভিন্নতা দেখা যায়।
লোকবিশ্বাসের বিস্তার
বনবিবি শুধু পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে নয়, বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলেও সমানভাবে পূজিতা। এমনকি জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুরের গভীর জঙ্গলে প্রতিবছর শীতকালে বনদুর্গা বা বনবিবির পূজা ও মেলার আয়োজন হয়—যা আজও বনের সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের প্রতীক হয়ে আছে।
বনবিবির লোককথা তাই কেবল এক ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং সুন্দরবনের মানুষ ও প্রকৃতির পারস্পরিক নির্ভরতার এক সাংস্কৃতিক দলিল।








