বাগরাম ঘাঁটি: কৌশলগত গ্রেট গেমের অংশ
সাইফুল খান
আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটি বিশ্ব রাজনীতিতে এক অনন্য অধ্যায়ের নাম। এই ঘাঁটির ইতিহাস, কৌশলগত গুরুত্ব এবং এর পুনর্নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা আজও থেমে নেই। এই মার্কিন ঘাঁটির অবস্থান আফগানিস্তানের পারওয়ান প্রদেশে, রাজধানী কাবুল থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে। সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের সময় ১৯৭৯ সালে এই ঘাঁটি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। সোভিয়েতরা এটিকে তাদের আফগান সামরিক অভিযানের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। পরবর্তীতে ২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর আমেরিকা আফগানিস্তানে তালেবানবিরোধী অভিযানের ঘাঁটি হিসেবে বাগরামকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। প্রায় দুই দশক ধরে এটি হয়ে ওঠে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সদরদপ্তর। সেখানে কয়েক হাজার সেনা অবস্থান করত।
বাগরামের গুরুত্ব বোঝার জন্য এটিকে ‘স্ট্যাটাস অফ ফোর্সেস এগ্রিমেন্ট’ (SOFA) বা দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি সামরিক ঘাঁটির দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা যায়। বর্তমানে সারা বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি রয়েছে। যেমন- দক্ষিণ কোরিয়ায় ওসান ও ইয়ংসান ঘাঁটি (উত্তর কোরিয়ার প্রতিরোধে), জাপানে ওকিনাওয়া ঘাঁটি (চীন ও উত্তর কোরিয়া পর্যবেক্ষণে), জার্মানির রামস্টেইন ঘাঁটি (ইউরোপে মার্কিন বাহিনীর সদরদপ্তর), কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটি (মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় মার্কিন বিমানঘাঁটি)। আফগানিস্তানের বাগরামও এই ধরণের ঘাঁটি, যা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে অনন্য গুরুত্ব বহন করত।
২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর বাগরাম এয়ারবেস বা বায়ুসেনা ঘাঁটি তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তবে গত কয়েক বছরে ভূ-রাজনীতির পালাবদল এবং নতুন আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে ওয়াশিংটন আবারও এই ঘাঁটির দিকে নজর দিয়েছে। বাগরাম শুধু একটি সামরিক ঘাঁটি নয়; বরং আফগানিস্তান তথা সমগ্র মধ্যএশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু। আমেরিকা কেন এটিকে পুনরায় নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছে, তার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে।
প্রথমত, চীন ও রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা ঠেকানো। আফগানিস্তান বর্তমানে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, আর রাশিয়া মধ্য এশিয়ার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় তার প্রভাব বিস্তার করছে। বাগরাম ঘাঁটি যদি আবার যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যায়, তবে এটি সরাসরি চীনের পরিকাঠামোগত ও বাণিজ্যিক প্রকল্পের উপর চাপ তৈরি করবে এবং রাশিয়ার মধ্য-এশিয়া কৌশলকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অর্থাৎ, আমেরিকার জন্য বাগরাম হবে একটি প্রতিরোধ ঘাঁটি, যা চীন-রাশিয়ার সমন্বিত প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম।
দ্বিতীয়ত, ইরানকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ বা নজরদারির সুযোগ। ভৌগোলিকভাবে বাগরাম ইরানের কাছাকাছি অবস্থান করছে। ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার আঞ্চলিক প্রভাব খতিয়ে দেখতে এই ঘাঁটি কার্যকর হবে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের ভূ-রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে উদ্বিগ্ন, বিশেষত সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে তার সম্পৃক্ততার কারণে। বাগরাম থেকে ইরান পর্যবেক্ষণ করা যেমন সহজ হবে, তেমনি প্রয়োজনে চাপ প্রয়োগের সামরিক সুবিধাও যুক্তরাষ্ট্র হাতে পাবে।
তৃতীয়ত, সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্তে এখনও সক্রিয় রয়েছে আল-কায়েদা, আইএস খোরাসান ও অন্যান্য নেটওয়ার্ক। ওয়াশিংটনের কাছে বাগরাম একটি পরীক্ষিত ঘাঁটি, যেখান থেকে অতীতে কথিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের জন্য গোয়েন্দা, ড্রোন হামলা এবং লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তালেবান সরকার এই গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র আবারও বাগরামকে কথিত সন্ত্রাস মোকাবিলার লজিস্টিক হাব হিসেবে দেখতে চাইছে।
চতুর্থত, মধ্য এশিয়ার প্রবেশদ্বার হিসেবে বাগরামের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আফগানিস্তান ভৌগোলিকভাবে এমন জায়গায় অবস্থিত, যেখান থেকে মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশে প্রবেশ কৌশলগতভাবে সহজ। এগুলো রাশিয়ার ঐতিহ্যগত প্রভাবাধীন হলেও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে তার উপস্থিতি বাড়াতে চায়। বাগরাম ঘাঁটি আবার সক্রিয় হলে এটি যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্য এশিয়ার জ্বালানি সম্পদ, বাণিজ্য পথ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাগরাম নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ কেবল সামরিক বা সন্ত্রাসবিরোধী নয়, বরং এটি একটি সর্বাত্মক ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। চীন ও রাশিয়ার প্রতিরোধ, ইরানকে পর্যবেক্ষণ, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম জোরদার এবং মধ্য এশিয়ায় প্রবেশাধিকার — সবকিছু মিলিয়ে বাগরামকে ওয়াশিংটন একটি ‘কৌশলগত মাস্টার কার্ড’ হিসেবে বিবেচনা করছে।
আফগানিস্তানের তালেবান সরকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাগরাম বিমানঘাঁটি পুনরুদ্ধারের দাবি এবং হুমকির বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা স্পষ্ট জানিয়েছে, বাগরাম ঘাঁটি আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের অংশ এবং এটি ফেরত দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।
সম্প্রতি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, আমরা বাগরাম ফিরে পেতে চাই। কারণ, এটি চীনের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার স্থান থেকে মাত্র এক ঘণ্টা দূরে। চীন আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটি পুনরুদ্ধারের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চীনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেছেন, এমন উত্তেজনা ও সংঘর্ষ উসকে দেওয়া এ অঞ্চলের জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীত। আফগানিস্তানের ভবিষ্যত আফগান জনগণের হাতেই থাকা উচিত এবং এই অঞ্চলে উত্তেজনা ও সংঘর্ষ উসকে দেওয়া সমর্থনযোগ্য নয়।
চীন আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় আগ্রহী এবং আফগান জনগণের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। চীনের মতে, বাগরাম বিমানঘাঁটি পুনরুদ্ধারের জন্য মার্কিন পদক্ষেপ আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে, যা চীনের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে।
এছাড়া, চীন আফগানিস্তানের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে আগ্রহী। গত মাসে চীনা বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই কাবুল সফরে গিয়ে আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা করেন। চীন আফগানিস্তানের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নত করতে আগ্রহী।
বাগরাম বিমানঘাঁটির ইতিহাস শুধু একটি সামরিক ঘাঁটির ইতিহাস নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক প্রতিচ্ছবি। সোভিয়েত ইউনিয়ন, আমেরিকা, তালেবান প্রত্যেকেই এই ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণকে তাদের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে রেখেছে। আজ যখন যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় বাগরামে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, তখন বিষয়টি শুধু আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে নয়, বরং চীন, রাশিয়া, ইরান এবং সমগ্র মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য ও সমীকরণকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যেই। বাগরাম তাই আজও ‘গ্রেট গেম’-এর অংশ, যেখানে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্য লড়াই করছে।








