এশিয়ার বৃহত্তম সংখ্যালঘু গ্রাম পুনিশোল বাঁকুড়ার এই অঞ্চলে উন্নয়ন নিয়ে ক্ষোভ তুঙ্গে
বিশেষ প্রতিবেদন
দেশের বৃহত্তম সংখ্যালঘু গ্রামের তকমা পাওয়া বাঁকুড়া জেলার পুনিশোল গ্রাম পঞ্চায়েত। এতবড় তকমা পাওয়া সত্ত্বেও এই গ্রামে উন্নয়ন সেভাবে হয়নি। তার নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক কারণ। স্থানীয় নেতাদের মধ্যে দলাদলি, গোষ্ঠী কোন্দল। আর তার জেরে মাশুল দিতে হচ্ছে খেটে খাওয়া দিনমজুর গরিবগুর্বো মানুষদের।
গত পঞ্চায়েত ভোটের তুলনায় এক লপ্তে এবার অনেক আসন বেড়েছে পুনিশোলে। গতবারে যেখানে ২১ টি আসন ছিল, এবার তা বেড়ে হয় ২৯। গত পঞ্চায়েত ভোটে ২১ এর মধ্যে ১৫ টি আসনে ভোট হয়েছিল। ৬ টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতে তৃণমূল এবং ভোটের লড়াইয়ে ১৫ টির মধ্যে ১১ টিতে তৃণমূল জয়ী হলেও বাকি ৪ টি আসন ছিনিয়ে নেন নির্দল প্রার্থীরা।
শেষবার মোট আসন ২৯ টি। তার মধ্যে মুসলিম অধ্যুষিত ২১ টি আসনের ১৬ টিতে রয়েছে গোঁজ প্রার্থী দিয়েছিলেন বিদায়ী তৃণমূল প্রধান রেজাউল মণ্ডল। আইএসএফ প্রার্থী দিয়েছিল ১৩ আসনে। এছাড়াও বাম এবং কংগ্রেস প্রার্থীরা ছিলেন। কিন্তু পুনিশোলের মুসলিম অধ্যুষিত আসনগুলিতে কোনও বিজেপি প্রার্থী নেই। আদিবাসী গ্রাম পেড়ারায় ১টি এবং নতুনগ্রাম ও আসনাসোলে হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামে আরও ৭ টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল বিজেপি।

এ তো গেল পঞ্চায়েত ভোটের কথা। এবার দেখা যাক, পুনিশোল গ্রামের উন্নয়ন বা অনুন্নয়নের ছবি। এখানে বেশিরভাগই গরীব, খেটে খাওয়া মানুষ। এখনও জলের সমস্যা মেটেনি। রাস্তাঘাট হয়নি। বর্ষায় রাস্তাগুলোতে কাদা মাখামাখি অবস্থা। ভাল কাজ করাই মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।”
স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানীয় জল, রাস্তা-সহ সামগ্রিক পরিকাঠামো উন্নয়নে বেশ কয়েক কদম পিছিয়ে রয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গ্রামের দাবিদার বাঁকুড়ার পুনিশোল। যে গ্রাম পুরসভার দাবি রাখে, সেখানে উন্নয়ন নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের পঞ্চায়েত সদস্যদের মধ্যেই রয়েছে ক্ষোভ।
বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রের এই গ্রামে ভোটারের সংখ্যা ২৩ হাজারের ওপর। এই গ্রামের ভোটের লিডের ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে বিষ্ণুপুর লোকসভার ফলাফল। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রাস্তা, পানীয় জল — কোনো কিছুর উন্নয়ন হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয় মানুষদের। আবার, গ্রামের বাসিন্দাদের একাংশের রয়েছে অনুন্নয়ন নিয়ে বিস্তর অভিযোগ।
জলের সমস্যা যে আছে, তা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরলেই বোঝা যায়। অবশ্য এসব অভিযোগ নিয়ে কোনও হেলদোল নেই গ্রাম পঞ্চায়েতের। তাই প্রকাশ্যে গ্রামের অনগ্রসরতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এখানকার বাসিন্দারা। দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়ায় সাবমার্সিবলের জল নিতে মহিলাদের ভিড়। জলের পাত্র নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন গৃহবধূ ও ছেলে-মেয়েরা। তারা এক হাতে বালতি, কলসী কোমরে তুলে জল নিয়ে যান বাড়িতে। এ দৃশ্য নিত্যদিনের। অথচ পঞ্চায়েত বলছে, চারশো-সাড়ে চারশো সাবমার্সিবল বসানো হয়েছে।

পুনিশোল গ্রামে রয়েছেন ১৪ জন পঞ্চায়েত সদস্য। ১১ জন তৃণমূল কংগ্রেসের, বাকি তিনজন নির্দল। পঞ্চায়েত প্রধানের দাবি অনুযায়ী, নির্দলরা সকলেই এখন তৃণমূলের সঙ্গেই রয়েছেন। কিন্তু গ্রামে সেভাবে উন্নয়নের কাজ হচ্ছে না বলে ক্ষোভ উগরে দিলেন তৃণমূলের স্থানীয় কর্মী ও সদস্যরা। কেউ বলেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রাস্তা, জল, সবেতেই আমরা পিছিয়ে রয়েছি। এই গ্রামে কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্রই নেই। তিনটে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে। আর আছে সাতটা প্রাইমারি স্কুল, ২৪টা অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, একটা হাইস্কুল, একটা জুনিয়র হাইস্কুল। হাইস্কুলে ২,৭০০ জন পড়ুয়া রয়েছে। প্রাথমিক স্কুলগুলোতে ৭০০-৮০০ ছাত্রছাত্রী রয়েছে। দুটি স্কুলের ক্ষেত্রেই শিক্ষক-শিক্ষিকা অপ্রতুল। সাড়ে চারশো নলকূপ বসানোর কথা। তাও কিন্তু সর্বত্র দেখা যাচ্ছে না।

রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের তরফে বাড়িতে সন্তান প্রসব বন্ধ করতে নানাভাবে প্রচার করছে। কিন্তু পুনিশোলের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগে স্থানীয়রা। বিশাল জনসংখ্যার গ্রামে দীর্ঘদিনের দাবি ছিল একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি হোক। কিন্তু আজও তা হল না। এমনকী গর্ভবতী মায়েদের জন্য ডেলিভারি পয়েন্ট করার কথা ছিল, তাও হয়নি। বাড়িতে ডেলিভারি ৮০-৯০ শতাংশ কমানো গেলেও এখনও মাসে দু-তিনটে ডেলিভারি বাড়িতেই হচ্ছে। পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। স্বাস্থ্য পরিষেবার সমস্যা কবে মিটবে বলা মুশকিল। স্থানীয়দের বক্তব্য, এখানে বেশিরভাগই গরীব, খেটে খাওয়া দিনমজুর মানুষ। এখনও জলের সমস্যা মেটেনি। রাস্তাঘাট হয়নি। বর্ষায় রাস্তাগুলোতে কাদা মাখামাখি অবস্থা। যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব খারাপ হওয়ায় পুরুষদের জন্য কাজকর্ম করাই মুশকিল।
স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম খানের অভিযোগ, “গ্রামে তেমন কিছুই উন্নয়ন হয়নি। ওপরে ওপরে উন্নয়ন। পানীয় জলের সমস্যা রয়েছে, স্কুলগুলোতে শিক্ষক অনেক কম, পড়ুয়া তুলনামূলক অনেক। সেই অনুপাতে কোনো স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। তবে কি নেতাদের দলাদলি বা কোন্দলের জন্যই উন্নয়ন থমকে গিয়েছে এশিয়ার তথাকথিত বৃহত্তম এই গ্রামে? পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষ অবশ্য অনুন্নয়নের অভিযোগ মানতে নারাজ। তাদের সাফাই হল, এটা সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এশিয়ার সর্ববৃহৎ গ্রাম। কমবেশি প্রায় ১ লক্ষ মানুষের বাস এখানে। জলের সঙ্কট ছিল। আমরা ৯০-৯৫ শতাংশ সমাধান করেছি। অনেক দিনের দাবি এখানে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য। প্রশাসনও বলেছিল। এখন অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। বাড়িতে ডেলিভারি বা সন্তান প্রসব অনেক কমে গিয়েছে। তবে রাস্তাঘাটের সমস্যা কিছুটা রয়েছে, যা অল্প সময়ে মেটানো সম্ভব নয়। ২২ কিলোমিটার ঢালাই রাস্তা হয়েছে।
একদিকে শাসকদলের মধ্য়েই উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্নের মুখে এশিয়ার বৃহত্তম সংখ্য়ালঘু অধ্যুষিত বিষ্ণুপুর লোকসভার পুনিশোল গ্রাম। অন্যদিকে সেই দাবি ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষ।








