আম্বানি-আদানি শীর্ষ ধনী হলেও শীর্ষ করদাতা নন
নতুন পয়গাম
নয়াদিল্লি, ১৬ সেপ্টেম্বর: দেশের শীর্ষ ধনকুবের হলেন মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানি। এরপরেই রয়েছেন যথাক্রমে টাটা-বিড়লা ইত্যাদি শিল্পগোষ্ঠী। কিন্তু এরা সবচেয়ে বেশি আয়কর দাতা নন। সবথেকে বেশি আয়কর দেন বলিউডের অভিনেতা অক্ষয় কুমার, প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি প্রমুখ। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন উঠে আসে। তাতেই জানা যায় এই চমকপ্রদ খবর। তার আগে দেশবাসী জানত, যেহেতু আদানি-আম্বানিরা সবথেকে ধনী শিল্পপতি, তাই হয়ত তারাই সবথেকে বেশি আয়কর দেন। অথবা আয়কর দাতার তালিকায় হয়ত শীর্ষস্থানে আছে টাটা-বিড়লা কিংবা গোয়েঙ্কা, রুইয়া, ঝুনঝুনওয়ালা ইত্যাদি গোষ্ঠী।
কিন্তু ২০২১-২২ সালে জমা দেওয়া আয়কর রিটার্নে দেখা যায়, দেশে সবথেকে বেশি করদাতা ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বোচ্চ স্থানে ছিলেন অক্ষয় কুমার। ওই বছর তিনি ২৯ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা আয়কর দিয়েছিলেন। আয়কর রিটার্নে তিনি জানিয়েছিলেন, ওই বছর তার আয় ৪৮৬ কোটি টাকা। বলিউড তারকা অক্ষয় কুমার ওই বছর সবচেয়ে বেশি সিনেমায় নায়কের চরিত্রে অভিনয় করে রেকর্ড করেন। এছাড়া তার নিজের প্রোডাকশন হাউস রয়েছে এবং স্পোর্টস টিমও চালান। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এনডোর্সমেন্ট থেকেও তিনি প্রচুর আয় করেন। ২০২০-২১ সালে তিনি আয়কর দিয়েছিলেন সাড়ে ২৫ কোটি টাকা। এর জন্য অক্ষয় কুমারকে বিশেষ সম্মানও দেয় কেন্দ্রীয় আয়কর দফতর।
অক্ষয় কুমারকে টেক্কা দিয়ে ২০২২-২৩ সালে সবথেকে বেশি আয়কর দাতার শিরোপা পান প্রাক্তন ক্রিকেট ক্যাপ্টেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। ওই বছর তিনি ৩৮ কোটি টাকা ইনকাম ট্যাক্স দেন। সেই নিরিখে ঝাড়খণ্ডের ভূমিপুত্র ধোনি এখন দেশের শীর্ষ করদাতা।
উল্লেখ্য, আদানি-আম্বানি, টাটা-বিড়লারা দেশের সর্বোচ্চ আয়করদাতা নন। কারণ, তারা প্রধানত কর্পোরেট কর প্রদান করে থাকেন, যা তাদের কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে পরিশোধিত হয়, ব্যক্তিগত আয়কর হিসেবে নয়। সেই দৃষ্টে আদানি গোষ্ঠী কিংবা রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের মতো সংস্থাগুলো দেশের শীর্ষ করদাতা কোম্পানির মধ্যে অন্যতম, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে মুকেশ আম্বানি বা গৌতম আদানি তাদের বিপুল সম্পদের জন্য নয়; বরং তাদের কোম্পানির কর পরিশোধের জন্য পরিচিত।
জানা গিয়েছে, রিলায়েন্স কোম্পানির মালিক মুকেশ আম্বানি বেতন হিসেবে কোনো টাকা নেন না, বরং কোম্পানি থেকে লভ্যাংশ হিসেবে আয় করেন। কর পরিশোধের ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগত আয় কম, কিন্তু তারা আয়কর, জিএসটি বা পণ্য পরিষেবা কর, শুল্ক ইত্যাদি-সহ বিভিন্ন রকমের কর দিয়ে থাকে।
দেশের শীর্ষ করদাতাদের মধ্যে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ, টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস বা টিসিএস এবং স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া-র মতো বড় সংস্থাগুলো অন্যতম। অক্ষয় কুমার বা মহেন্দ্র সিং ধোনি সেরা আয়কর দাতা হলেও তারা আদানি-আম্বানির মতো অত বড় সম্পদশালী বা ধনকুবের নন। তাদের যাবতীয় ইনকাম ব্যক্তিগত উপার্জন।
উল্লেখ্য, বিশ্বের সেরা ধনকুবেরের তালিকায় প্রথম সারিতে আছেন আম্বানি, আদানিরা। এসব কর্পোরেট ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিরা সামাজিক সেবামূলক কাজ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিপর্যয়-সহ বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতিতে কোটি কোটি টাকা দান করে থাকেন। কিন্তু এই তালিকাতেও আম্বানি, আদানির থেকে এগিয়ে আছেন টাটা শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা দানবীর জামশেদজি টাটা। ভারতের ‘ইস্পাত মানব’ হিসেবে পরিচিত জামশেদজি টাটা দান ও অনুদান আকারে মোট ৮,২৯,৭৩৪ কোটি টাকা দিয়ে সর্বকালের রেকর্ড করে গিয়েছেন। ২০২১ সালে প্রকাশিত ‘হুরুন ইন্ডিয়া’ রিপোর্টে ভারতের সবচেয়ে বড় দাতা হিসেবে জামশেদজি টাটার নাম উঠে আসে। বিভিন্ন দাতব্য খাতে অনুদান আকারে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ তিনি প্রদান করেছিলেন। দেশের বিভিন্ন নামজাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, শিশু শিক্ষা থেকে শুরু করে জরুরি বা আপৎকালীন পরিস্থিতিতে জামশেদজি টাটা দান করেছেন মোট ৮ লক্ষ কোটি টাকা।
১৮৬৮ সালে জামশেদজি টাটা প্রতিষ্ঠিত টাটা গ্রুপ বর্তমানে প্রায় ৩০ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের কোম্পানি। ৩০টিরও বেশি কোম্পানি রয়েছে এই গোষ্ঠীর। ১০টিরও বেশি শিল্প-কারখানা ছাড়াও বিভিন্ন দেশে টাটা গ্রুপ কাজ করছে। টাটা গ্রুপ আয়ের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা, সচেতনতাতেও তুলনামূলক অনেক এগিয়ে। জামশেদজি টাটার দেখানো পথে টাটা গোষ্ঠীর আরেক নামজাদা প্রাণপুরুষ রতন টাটাও তার আমলে কোম্পানিকে সফলভাবে পরিচালনা করেছেন। অতিমারি কোভিড পরিস্থিতিতে রতন টাটার সময়েই তাদের কোম্পানি ১,৫০০ কোটি টাকারও বেশি কেন্দ্রীয় সরকারের ত্রাণ তহবিল ‘পিএম কেয়ার্স ফান্ড’-এ দান করেছিলেন।
জানা যায়, টাটা গোষ্ঠীর পর সবচেয়ে বেশি অর্থ অনুদান দিয়েছেন উইপ্রো কোম্পানির কর্ণধার আজিম প্রেমজি। দেশের বিভিন্ন সেবামূলক খাতে এ পর্যন্ত ১,৭৬,০০০ কোটি টাকা দিয়েছেন তিনি।








