দ্বীন ও দুনিয়ার সমন্বয়ে আদর্শ শিক্ষার দিশারি আল ফুরকান স্কলার একাডেমি ও জিএস গার্লস মিশন
চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মুতাআল্লিম গিয়াসউদ্দিনের একান্ত সাক্ষাৎকার
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সাংবাদিক এম নাজমুস সাহাদাত
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার জটিলতা, প্রতিযোগিতা ও মূল্যবোধের ক্রমাগত অবক্ষয়ের সময়ে একটি প্রতিষ্ঠান যখন শিক্ষা নয়, বরং সুন্দর মানুষ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে আসে তখন তা স্বভাবতই বিশেষ নজর কাড়ে। উত্তর দিনাজপুর জেলার করনদিঘী ব্লকের মাগনাভিটার পূর্ব ফতেপুর এলাকায় অবস্থিত আল ফুরকান স্কলার একাডেমি ও জিএস গার্লস মিশম সেই বিরল উদ্যোগগুলির মধ্যে অন্যতম, যেখানে ইসলামিক আদর্শ ও আধুনিক শিক্ষাকে সমন্বয় করে নতুন প্রজন্মকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার প্রয়াস চলছে। সম্প্রতি এই প্রতিষ্ঠানের এক দায়িত্বশীল ব্যক্তির সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে উঠে এলো প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য, শিক্ষা পদ্ধতি, শৃঙ্খলা, ভবিষ্যৎ লক্ষ্য এবং সমাজের ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য।
নতুন পয়গাম পত্রিকার পক্ষ থেকে আপনাকে শুভেচ্ছা। জনাব, প্রথমেই জেনে নিতে চাই, এই মিশন প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ও অনুপ্রেরণা কী?
চেয়ারম্যান বলেন, আমরা লক্ষ্য করেছি ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণকারী বহু শিশু আধুনিক পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে। আবার আধুনিক শিক্ষা নেওয়া অনেক শিশু নৈতিকতা, মানবিকতা ও আচরণগত মূল্যবোধে দুর্বল হয়ে যায়। এই দুই চরম অবস্থার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক পথে এগোতে বাধাগ্রস্ত করে। তাই আমাদের মূল প্রেরণা হলো দ্বীন ও দুনিয়ার সমন্বিত পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা। তিনি আরও জানান, এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে এক সহজ নীতিতে “শিক্ষা শুধু পেশা নয়, শিক্ষা হলো চরিত্র।”
ইসলামিক ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় কীভাবে কার্যকর হচ্ছে?
এখানে শিক্ষার্থীরা কেজি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত আধুনিক ও ইসলামিক শিক্ষার সমন্বয়ের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী সাধারণ শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি পাচ্ছে, কিরাত, আরবি ভাষা ও ইসলামিক স্টাডিজ, হিফজ ও তাযকিয়া, আকিদা ও আখলাকের পাঠ। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সাজানো পাঠসূচির মধ্যে ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষা সমান গুরুত্বে পরিচালিত হয়। বাংলা, ইংরেজি এবং গণিত শিক্ষায় বিশেষ দক্ষতা গড়ে তোলা হয়, যাতে শিক্ষার্থীরা সমাজে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে পারে। তিনি বলেন, “আমাদের উদ্দেশ্য কাউকে শুধু আলেম বানানো নয়, বা শুধু ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানানোও নয়। আমরা চাই জ্ঞানী, সচেতন, নৈতিক এবং দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করতে।”
আপনার প্রতিষ্ঠানের বিশেষত্ব কী?
প্রতিষ্ঠানে শুধু বই পড়ানোর মধ্যেই শিক্ষা সীমাবদ্ধ নয়। দৈনিক নামাজে জামাতে অংশগ্রহণ, আচরণ ও ব্যবহারবিধি শেখানো হয়। শিক্ষক ও কর্মীদের অনুকরণীয় আচার-আচরণ, হোস্টেলে শৃঙ্খলাপূর্ণ সময়সূচি, নিয়মিত নৈতিকচর্চা পাঠ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে একটি সুন্দর পরিবেশে চরিত্রবিকাশ নিশ্চিত করা হয়। তিনি বলেন, এখানে শিক্ষকরা শুধু পাঠদান করেন না তাঁরা পথপ্রদর্শক, অভিভাবক ও আদর্শরূপে পাশে থাকেন। এছাড়াও শিক্ষার মান বজায় রাখা ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রতিষ্ঠানে প্রতিটি শিক্ষকের জন্য নিয়মিত, ট্রেনিং প্রোগ্রাম, মাসিক কর্মশালা, পর্যবেক্ষণ ও রিভিউ ক্লাস, অভিভাবক–শিক্ষকদের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে নিয়মিত ইউনিট টেস্ট, টার্ম পরীক্ষা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য স্পেশাল গাইডেড ক্লাস চালু রয়েছে। ফলাফল বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ পাঠদানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা হয়।
কীভাবে এটি অন্যান্য সাধারণ বিদ্যালয় থেকে আলাদা?
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এখানে শুধু পরীক্ষায় নাম্বার তোলার প্রতিযোগিতা নেই। রয়েছে মানুষ হওয়ার শিক্ষা। অন্য বিদ্যালয়ে জ্ঞান দেওয়া হয়, কিন্তু এখানে জ্ঞানের সঠিক ব্যবহার, নিয়ন্ত্রণ ও নৈতিক প্রয়োগ শেখানো হয়। এছাড়া ছেলেদের ও মেয়েদের জন্য নিরাপদ আবাসিক ব্যবস্থা, আলাদা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং সর্বক্ষণের তত্ত্বাবধান এই প্রতিষ্ঠানের বিশেষত্ব। তার বক্তব্য, আমরা এই অল্প সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে আমাদের ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি থেকে ইসলামিক স্কলার বানাতে সক্ষম হয়েছে। এবং আমাদের ছেলেমেয়েদের প্রফেশনাল কোর্সে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী ইত্যাদি বানাতেও আশাবাদী।
অভিভাবক ও সমাজের সহযোগিতা কেমন পাচ্ছেন?
তিনি বলেন, অভিভাবকদের আস্থা আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁদের দোয়া, মতামত এবং সহযোগিতাই আমাদের পথকে সহজ করছে।
প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও পরিকল্পনা নিয়ে নিয়মিত অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা সভা হয়। সমাজের শিক্ষাদরদী ও শিল্পপতি মানুষদের সহযোগিতায় আরও এগিয়ে যাচ্ছি আমরা।
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও উন্নয়ন পরিকল্পনা কী?
উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা সম্প্রসারণ, উন্নত বিজ্ঞান ও কম্পিউটার ল্যাব, বৃহৎ লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র, ছাত্রছাত্রীদের জন্য আলাদা আধুনিক হোস্টেল ভবন, ক্যারিয়ার গাইডেন্স ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেল চালু করা। তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, আমরা চাই আমাদের শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে হোক ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিচারক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পাশাপাশি নৈতিক ও আদর্শবান মানুষ। অবশেষে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে যখন শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ প্রবল, তখন আল ফুরকান স্কলার একাডেমি তার ভিন্ন পথে চলছে মানুষ গড়ার পথে, নৈতিকতার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার দিকে। এই প্রচেষ্টাই সমাজে নতুন প্রজন্মকে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে প্রেরণা জোগাবে এমনটিই প্রত্যাশা এলাকার সাধারণ মানুষের।









