স্বাধীনতার মশাল নাকি প্রতারণার ধোঁয়া?
শ্বেতা দাস, নতুন পয়গাম:
দিনটা ছিল ৩১শে মার্চ, ১৯২৯। নিউইয়র্কের ইস্টার প্যারেডে তরুণীরা হাতে জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে হাঁটলেন রেড কার্পেটে। তার আগে নারীরা কখনো এইভাবে প্রকাশ্যে এসে ধূমপান করেনি। বরঞ্চ শোনা যেত, কেউ যদি প্রকাশ্যে এসে ধূমপান করত, তাহলে তাদের শাস্তি হিসেবে জেলে দেওয়া হত। একটি মার্কেটিং কতদূর প্রভাব ফেলেছে তা-ই আসলে লক্ষ্য করার বিষয়।
আসল প্রশ্ন হল: সত্যি বলতে, এই ‘স্বাধীনতা’ কার জন্য? নারীর জন্য, নাকি তামাক কোম্পানির জন্য? বলাই যায়, প্রতিটি প্যাকেট বিক্রিতে রয়েছে কর্পোরেশনের মুনাফা, তাও আবার নারী-পুরুষের স্বাস্থ্যহানির বিনিময়ে। তবে কীভাবে এই সিগারেট নারীদের কাছে স্বাধীনতার মশাল হয়ে উঠল?
১৯২৯ সালে বিখ্যাত সিগমন্ড ফ্রয়েডের ভাগ্নে এবং জনসংযোগের জনক এডওয়ার্ড বার্নেসের একটি প্ল্যান, যা নারী সমাজের হাতে তুলে দিয়েছে ‘স্বাধীনতার মশাল (Torch of Freedom)। বার্নেস নারীদের হাতে স্বাধীনতার নামে যে মশাল ধরিয়ে দিলেন, সেটি আসলে কর্পোরেট অর্থ-লোভের আগুন। সেই আগুন আজও আমাদের পুড়িয়ে চলেছে। আজ সকলেই জানে, ধূমপান শরীর ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক। এটি ফুসফুস ক্যানসার, হৃদরোগ, বন্ধ্যাত্ব, গর্ভাবস্থার জটিলতা — ইত্যাদি বহু রকমের জটিল রোগ-ব্যাধির কারণ।
প্রতিটি প্যাকেটে সতর্ক বার্তা লেখা আছে, প্যাকেটের গায়ে ভয়াবহ ছবিও ছাপা আছে। তারপরও সিগারেটের সঙ্গে আত্মবিশ্বাস ও আধুনিকতার সম্পর্ক যেন অটুট। কারণ, বার্নেসের তৈরি মিথ বিজ্ঞানকে হারিয়ে সংস্কৃতিতে ঢুকে গেছে। সিনেমায় নারীর হাতে সিগারেট মানেই স্মার্ট ও আত্মবিশ্বাসী চরিত্র। অফিসের বিরতিতে সিগারেট আবশ্যক, কিশোরীর কাছে এটি বিদ্রোহের প্রতীক। ফলে একজন নারী যখন সিগারেট ধরান, তিনি হয়ত ভাবেন তিনি আধুনিক ও স্বাধীন। অথচ তিনি অজান্তেই এক শতাব্দী পুরনো বিজ্ঞাপনের কৌশলকে পুনরাবৃত্তি করছেন। আজ প্রায় এক শতাব্দী পরও সেই ধোঁয়া রয়ে গেছে। স্কুল-কলেজের উঠোন থেকে কর্মক্ষেত্রের করিডোরে, চলচ্চিত্র থেকে বিজ্ঞাপনের পাতায় — সিগারেট আজও নারীর আত্মবিশ্বাস, সাহস ও আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু এই ‘পছন্দের’ আড়ালে রয়েছে নির্মম সত্য: ধূমপান কখনও স্বাধীনতা ছিল না, এটি ছিল এক নিখুঁত প্রভাব বিস্তার।
এই ‘ফ্যাশন’ নারীর কোনো উপকার করে না, শুধু কর্পোরেট পুঁজিবাদেরই মুনাফা বাড়িয়েই চলেছে। নারী-বাদের শব্দভাণ্ডারকে চুরি করে এটি ব্যবহৃত হয়েছে বাণিজ্যের জন্য, নারীর ক্ষমতায়নের জন্য নয়। এই প্রতারণার শিকড় বোঝার জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই সময়ে। বিশ শতকের গোড়ায় মার্কিন নারীরা ভোটাধিকার অর্জন করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশকরছেন, জনজীবনেদৃশ্যমানহতে শুরু করেছেন। সেই আত্ম বিশ্বাসের বাতাসে সুযোগও ছিল, আবার বাধাও ছিল অনেক। সেই সময় আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি নারীদের সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস করাতে বার্নেসকে নিয়োগ করেছিলেন। আর এখানেই তিনি যুক্তিতে নয়, আবেগে আঘাত করলেন।
ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব ব্যবহার করে তিনি সিগারেটকে ক্ষমতা, যৌনতা আর বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত করলেন। বার্তা ছিল সহজ: যদি নারীরা সিগারেট না খায় তবে তারা পুরুষদের সমান হতে পারবে না। আর এই আবেগের অস্ত্র হল ‘নারীবাদ’। আর এখানেই আসল ভুলটি। নারীবাদ মানেই সমতা। তাহলে নারীবাদ কি এখানেও আমাদের অবিকল পুরুষদের নকল করা শেখায়? নারীবাদ বা ফেমিনিজম মানে এই নয় পুরুষদের ক্ষতিকর অভ্যাস নকল করা বা তাদের সাথে নিজেদেরকে তুলনা করা। একজন নারী সিগারেট ধরিয়ে শক্তি প্রমাণ করেন না, বরং প্রমাণ করেন বিজ্ঞাপনের প্রভাব কতটা সফল হয়েছে। আর বিজ্ঞাপন এই ভাবে সিগারেটকে করে তুলল এক ভুয়ো নারীবাদের প্রতীক। যা আদতে ছিল ভীষণ স্বাস্থ্য-ঝুঁকি, অথচ সেটিকে দেখানো হল স্বাধীনতার অস্ত্র হিসেবে। আর আমরা দুঃখজনকভাবে সেই ফাঁদে পা দিয়েছি। কেউ ভাবছে এটিই আধুনিকতা, আবার কেউ ভাবছে এটি আত্মবিশ্বাস, আবার কেউ ভাবছে এটিই সমতা। অথচ প্রতিটি টান শুধু ফুসফুসে নয়, আত্মার ভেতরেও আগুন ধরায়।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হল — নারীর দেহ যে শুধু নিজের নয়, তা আমরা ভুলেই গেছি, এটি জীবন জন্ম দেওয়ার আশ্রয়। গর্ভাবস্থায় ধূমপান মানে সেই আশ্রয়কে নিজ হাতে ভেঙে ফেলা। অকালপ্রসব, মৃত-শিশু, বিকলাঙ্গতা —কত ভয়াবহ ঝুঁকি লুকিয়ে থাকে প্রতিটি সিগারেটে। তবুও সমাজ প্রশংসা করে — ‘দেখো, আমরা কত আধুনিক! কত সাহসী!’ কিন্তু আসল সাহস তো এখানে নয়। আসল সাহস হল সেই সিগারেটকে প্রত্যাখ্যান করা, সমাজের চোখে নয়, নিজের অন্তরে স্বাধীন হওয়া।
এডওয়ার্ড বার্নেসের চালাকির কাছে নারীরা এক সময় হার মানতে পারেন। তিনি যেভাবে খুব সহজেই স্বাধীনতার মতো মহৎ ধারণাকে বিপণনের খেলায় বদলে দিয়েছিলেন, তা আমাদের পক্ষে বোঝা তখন সম্ভব হয়নি ঠিকই। তবে এখন সময় এসেছে, নতুন করে স্বাধীনতার সংজ্ঞা দেওয়ার।
যে ‘স্বাধীনতার মশাল’ নারীদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বার্নেসের হাত ধরে, সেটি আসলে ধোঁয়ার মিথ্যা শিখা বা প্রোপাগান্ডা। তবে সত্যিকারের স্বাধীনতার মশাল রয়েছে আমাদের কাছেই, আর তা হল জ্ঞান, স্বাস্থ্য আর আত্মমর্যাদার আগুন। আমাদের ভাবতে হবে, যখন আমরা সিগারেট ধরাই — এটি কি সত্যিই আমাদের স্বাধীনতা দিচ্ছে? নাকি ইতিহাসের এক চতুর প্রতারণার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে? আমরা সকলেই অবগত যে, আমাদের শক্তি হল নিজের স্বাস্থ্য। আমাদের উচিত নিজেদের স্বাস্থ্যকে ভালবাসা, নিজের শরীরকে যত্ন ও সম্মান করা।
আমাদের স্বাধীনতা আছে বলেই আমাদের হাতেই রয়েছে নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং আমাদের উচিত সেটি নিরাপদ রাখা। আমাদের এই কথা মানতেই হবে শক্তি ধোঁয়ায় নয়, মর্যাদা অনুকরণে নয়, স্বাধীনতা আসক্তিতে নয়। নারী ও পুরুষ উভয়েরই উদ্দেশ্য হল সেই দেহকে সুরক্ষিত রাখা। আমাদের স্বাধীনতা হল প্রতারণা অস্বীকার করা, এবং ধোঁয়ার পরিবর্তে স্বচ্ছতা বেছে নেওয়া। নারীবাদ মানে সিগারেটের ধোঁয়ায় নিজেকে প্রমাণ করা নয়। নারীবাদ মানে নিজের ভেতরের শক্তিকে বুঝে নেওয়া। সমতা মানে পুরুষের ভুলকে নকল করা নয়, বরং নিজস্ব মর্যাদার পথ তৈরি করা। তবেই সেই ভুয়ো “সিগারেটের মশাল” নিভিয়ে দিয়ে আমরা প্রকৃত স্বাধীনতার মশাল জ্বালাতে পারব, যা হবে সুস্থ দেহ, মন ও সঠিক পথে চলার স্বাধীনতা। নারীর ও পুরুষের আসল স্বাধীনতা ধোঁয়ায় নয়, বরং আলোকেই বেছে নেওয়ায়।




