নভোচারীদের মৃত্যুমুখে ঠেলে দিচ্ছে নাসা?
নতুন পয়গাম: চাঁদের বুকে পুনঃরায় মানুষের পদচিহ্ন আঁকতে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট আর্টেমিস এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের অপেক্ষায়। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি চার নভোচারীকে নিয়ে চাঁদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে ওরিয়ন মহাকাশযান। তবে এই ঐতিহাসিক যাত্রার প্রাক্কালে মহাকাশ গবেষণা সংস্থাটির অন্দরেই দানা বাঁধছে গভীর বিতর্ক। মূল আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ওরিয়ন মহাকাশযানের ‘হিট শিল্ড’ (তাপ সুরক্ষা বর্ম)। এর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ফেরার সময় নভোচারীদের চরম উত্তাপ থেকে রক্ষা করার কথা।
কিন্তু ২০২২ সালের আর্টেমিস-১ মিশনে এই হিট শিল্ড প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করেনি। মনুষ্যবিহীন সেই পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় ওরিয়নের নিচের অংশের তাপ সুরক্ষা বর্ম থেকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে পোড়া উপাদানের বড় বড় টুকরো খসে পড়ছে। এই ত্রুটি জানার পরও নাসা কেন মানববাহী মিশন শুরু করতে চাইছে, তা নিয়ে এখন তোলপাড় শুরু হয়েছে নানা মহলে।
নাসার প্রাক্তন নভোচারী এবং হিট শিল্ড বিশেষজ্ঞ ড. চার্লি কামার্ডা এই মিশনকে ‘উন্মাদনা’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, যেখানে একটি নিশ্চিত প্রযুক্তিগত ত্রুটি ধরা পড়েছে, সেখানে নভোচারীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তিনি কলম্বিয়া মহাকাশযান দুর্ঘটনার উদাহরণ টেনে সতর্ক করেন, অতীতেও নাসা ছোটখাট ত্রুটিকে অবহেলা করে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল।
অন্যদিকে, নাসার বর্তমান নেতৃত্ব এবং অন্য একদল বিশেষজ্ঞ দাবি করছেন, তারা সমস্যাটির মূল কারণ উদ্ঘাটন করেছেন। নাসার তদন্ত অনুযায়ী, আর্টেমিস-১ এর হিট শিল্ড তৈরিতে ব্যবহৃত উপাদানের ছিদ্রযুক্ত হওয়ার হার বা পারমিয়াবিলিটি কম ছিল, যার ফলে ভেতরে গ্যাস জমে চাপের সৃষ্টি হয়েছিল এবং উপাদানগুলো ভেঙে পড়েছিল। এই ঝুঁকি কমাতে আর্টেমিস-২ এর জন্য নাসা পুনরায় নকশা না বদলে; বরং মহাকাশযানের পৃথিবীতে ফেরার পথ বা ট্র্যাজেক্টরি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা মনে করছে, ফেরার পথ কিছুটা বদলে দিলেই উত্তাপের তীব্রতা কমে আসবে এবং বর্তমান হিট শিল্ড দিয়েই নিরাপদে ফেরা সম্ভব হবে।
তবে এই যুক্তি মানতে নারাজ ড. কামার্ডার মতো বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কম্পিউটারে করা সিমুলেশন আর বাস্তবের চরম পরিবেশ সবসময় এক হয় না। বিশেষ করে ওরিয়ন যখন শব্দের চেয়ে ৩০ গুণ বেশি গতিতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকবে, তখন ৫০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় হিট শিল্ড কীভাবে আচরণ করবে, তা শতভাগ নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। তারা মনে করেন, নাসা হয়ত সময়ের সীমাবদ্ধতা এবং বিশাল বাজেটের চাপে পড়ে তড়িঘড়ি এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কারণ, আর্টেমিস প্রজেক্টে ইতিমধ্যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে এবং কয়েক দফা দেরিও হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে চার নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং জেরেমি হ্যানসেনকে নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা নাসার বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। শেষ পর্যন্ত নাসা যদি এই মিশন সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারে, তবে তা হবে প্রযুক্তির জয়। আর যদি সামান্যতম কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তবে তা মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। বিজ্ঞানীদের একাংশ বলছেন, মহাকাশযাত্রায় ঝুঁকি থাকবেই, কিন্তু জানা ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা করাটা কতটা নৈতিক?








