টসে নির্ধারণ কে আগে রক্তদান করবে! মানবিক দৃষ্টান্তে হরিশ্চন্দ্রপুর বইমেলা ২০২৬
নতুন পয়গাম, এম নাজমুস সাহাদাত, মালদহ: কয়েন উড়িয়ে টস করে সিদ্ধান্ত নেওয়া কে আগে রক্তদান করবে! এমনই এক অভিনব ও মানবিক ঘটনার সাক্ষী থাকল হরিশ্চন্দ্রপুর বইমেলা ২০২৬-এ আয়োজিত রক্তদান শিবির। বইমেলা কমিটির সহযোগিতায় আপনা চ্যারিটি এন্ড ফাউন্ডেশন-এর উদ্যোগে জানুয়ারি ২০২৬ মাসে অনুষ্ঠিত এই শিবিরটি শেষ পর্যন্ত শিক্ষক–ছাত্র সম্পর্কের সৌজন্য ও শ্রদ্ধার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে ওঠে। ৩ জানুয়ারি থেকে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত হরিশ্চন্দ্রপুর হাই স্কুলের মাঠে এলাকার শিক্ষক-শিক্ষিকাদের যৌথ প্রচেষ্টায় অনুষ্ঠিত হয় হরিশ্চন্দ্রপুর বইমেলা ২০২৬। স্থানীয় সাহিত্য–সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি পাঠ্যাভ্যাস গড়ে তোলা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ছিল এই মেলার অন্যতম উদ্দেশ্য। এই উপলক্ষে আপনা চ্যারিটি এন্ড ফাউন্ডেশন-এর পক্ষ থেকে আয়োজিত হয় ফ্রি ব্লাড গ্রুপ টেস্ট শিবির, একটি সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা শিবির, চক্ষু পরীক্ষা শিবির এবং মেলার শেষ দিনে একটি রক্তদান শিবির। এলাকায় রক্তের প্রয়োজনীয়তা এবং রক্তদানের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা ছড়ানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে উদ্যোক্তারা জানান। রক্তদান শিবির শুরু হতেই দেখা যায় এলাকার তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষ প্রতিজন স্বতঃস্ফূর্তভাবে রক্তদান করতে এগিয়ে আসছেন। পরিবেশ ছিল হাসিখুশি ও ইতিবাচক। কিন্তু শিবির মাঝপথে শুরু হয় এক অভিনব প্রতিযোগিতা কে আগে রক্তদান করবেন? হরিশ্চন্দ্রপুর হাই স্কুলের শিক্ষক বাপ্পাদিত্য মণ্ডল এবং তাঁর ছাত্র সাব্বির আলম উভয়েই আগে রক্তদান করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। একজন শিক্ষক ও একজন ছাত্রের মাঝের এই সুস্থ প্রতিযোগিতাকে ঘিরে মুহূর্তেই সৃষ্টি হয় ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি।
কেউ ছাড় দিতে রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক মফিজউদ্দিন মহাশয় একটি সমাধান প্রস্তাব করেন। তাঁর উপস্থিতিতে কয়েন টস করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কে আগে রক্ত দেবেন। সকলের সম্মতিতে কয়েন ছোঁড়া হয়। কয়েনের ‘হেড’ পড়ায় টস জিতে যায় ছাত্র সাব্বির আলম। উপস্থিত জনতা সাব্বিরের জয়ে অভিনন্দন জানালেও আসল চমক ছিল টসের পরবর্তীতে সাব্বিরের সিদ্ধান্তে। সাব্বির জানায়, যেহেতু উনি আমার শিক্ষক, তাই রক্তটা উনিই আগে দেবেন। এই কথা শুনেই শিবির প্রাঙ্গণে উপস্থিত প্রত্যেকে বিস্মিত ও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। মুহূর্তেই চারদিকে করতালির ঝড় ওঠে। শিক্ষক বাপ্পাদিত্য মণ্ডলও ছাত্রের এই আচরণে গর্ব প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ছাত্রদের কাছে শ্রদ্ধা ও নম্রতা এভাবে প্রকাশ পেলে শিক্ষক হিসেবে তৃপ্তি পাওয়া যায়।
এই মানবিক ঘটনার তাৎপর্য নিয়ে বক্তব্য রাখেন আপনা চ্যারিটি এন্ড ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান আসফাক হুসেন। তিনি বলেন, আমরা বহু বছর ধরে রক্তদান শিবির আয়োজন করে আসছি। অসংখ্য মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখেছি, কিন্তু শিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে এমন মানবিক সৌহার্দ্য, শ্রদ্ধা ও বিনয়ের প্রতিযোগিতা আগে কখনও দেখিনি। ছাত্রটি টস জিতে নিজের অধিকার ছেড়ে শিক্ষককে অগ্রাধিকার দিয়েছে এটাই প্রকৃত শিক্ষা। এই দৃশ্য নতুন প্রজন্মের কাছে একটি জীবন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, যেখানে প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতা হলো শেষ কথা। তিনি আরও বলেন, “আজকের সমাজে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা ও প্রতিযোগিতার মানসিকতা ক্রমশ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষক–ছাত্র সম্পর্কের এই উদাহরণ সমাজে মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব আবারও মনে করিয়ে দিল। রক্তদান শিবির শেষে অনেকেই জানান, রক্তদান শুধু জীবন বাঁচানোর কাজ নয় বরং এটি সহমর্মিতা, দায়বদ্ধতা ও সামাজিক দায়িত্বের বহিঃপ্রকাশ। সাব্বির ও বাপ্পাদিত্য মণ্ডল সেই দায়িত্বকে আরও তাৎপর্যময়ভাবে তুলে ধরলেন। হরিশ্চন্দ্রপুর বইমেলা ২০২৬ তাই শুধু বইয়ের প্রদর্শনী পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকল না মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে দিল সমাজেও। এমন দৃশ্য সত্যিই বিরল। এই রক্তদান শিবির প্রমাণ করল সংস্কৃতি ও শিক্ষার মেলবন্ধন সমাজকে শুধু সমৃদ্ধই করে না, বরং মানবিক করে তোলে।








