শেষ নিঃশ্বাসে এক শিল্পীর আর্তনাদ – স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি ‘কারুবাসনা’
নতুন পয়গাম, অতসী মন্ডল, কোলকাতা: কুমোরটুলির মাটির গন্ধ, শিল্পীর নিঃশ্বাসে জমে থাকা শতাব্দীর ঐতিহ্য আর জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষের প্রশ্ন- এই সবকিছুকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র ‘কারুবাসনা’। গল্প, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় রয়েছেন অমিত দাস। ছবিটির প্রযোজনা করেছেন ডঃ অজয় চক্রবর্তী ও পুষ্প দে ফিল্মস। অশীতিপর অভিজ্ঞ মৃৎশিল্পী কুঞ্জ বিহারী পাল; যাঁর শিল্পকর্ম বাংলার গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছেছে নিউ জার্সি, জর্জিয়া সহ বিদেশের নানা প্রান্তে- এই ছবির মূল কেন্দ্রবিন্দু। কুমোরটুলির বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই শিল্পী যেন নিজেই এক জীবন্ত ইতিহাস। কিন্তু এবছর দুর্গাপুজোর আগে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকের কড়া নিষেধে মাটির কাজে হাত দিতে না পারায় তাঁর জীবনে নেমে আসে গভীর অনিশ্চয়তা ও মানসিক টানাপোড়েন।
শিল্পী কি তবে কাজ না করতে পারলেই বাতিল হয়ে যায়?
শুধু কাজ থেকে, না কি জীবন থেকেই?
এই প্রশ্নই ‘কারুবাসনা’র মূল সুর।
ছবিতে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন নিমাই ঘোষ, চয়ন দে ও গার্গী রায় চৌধুরী। নিমাই ঘোষের অভিনয়ে কুঞ্জ বিহারী পাল চরিত্রটি যেন নিঃশ্বাস ফেলে ওঠে। তাঁর কন্যা চারুমতী পাল মা-হারা, বাবার প্রধান শিষ্যদের একজন। অন্যদিকে শিবেন—কুঞ্জর আরেক প্রধান শিষ্য, চারুমতীর সঙ্গে বেড়ে ওঠা এবং আবেগে জড়িয়ে থাকা মানুষটি। এই তিনটি চরিত্রকে ঘিরেই তৈরি হয় সম্পর্ক, দ্বন্দ্ব ও উত্তরাধিকারের জটিল সমীকরণ। কুঞ্জ চান এক চালায় দু’টি সুতো বাঁধতে—চারু ও শিবেনের মিলনে পারিবারিক ও শিল্পী উত্তরাধিকারকে সুরক্ষিত করতে। কিন্তু সসম্মানে শিবেন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। কেন এই প্রত্যাখ্যান? কোথায় সেই অদৃশ্য দ্বন্দ্ব, যা সম্পর্কের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে ছবিটি।
পরিচালক অমিত দাস জানিয়েছেন, একজন শিক্ষানবিশ শিল্পীর নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান পার্থিব ও অপার্থিব সম্পদ কেড়ে নেয়। সেই চাওয়া ও হারিয়ে যাওয়ার দ্বন্দ্বই শিল্পী মনকে ক্ষতবিক্ষত করে। ‘কারুবাসনা’ সেই মানসিক যাত্রাকেই চিত্রিত করার এক আন্তরিক প্রয়াস। উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই ছবির সঙ্গে যুক্ত কেউই কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করেননি। নিঃস্বার্থভাবে, সম্মিলিত শ্রম ও ভালোবাসায় তৈরি হয়েছে ‘কারুবাসনা’ – দর্শকদের হাতে একটি সৎ ও সংবেদনশীল শিল্পকর্ম তুলে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই প্রচেষ্টা। স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি ‘কারুবাসনা’-র প্রথম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হতে চলেছে আগামী ২৩ জানুয়ারি, ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক কলকাতা শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-এ। সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায়, রোটারি সদন-এ ছবিটি প্রদর্শিত হবে।
শিল্প কি শুধু হাতে বাঁচে?
না কি হৃদয়ে?
এই প্রশ্ন রেখেই দর্শকের মনে থেকে যেতে চায়
‘কারুবাসনা’।








