ঐক্যের পয়গাম তাবলিগ ইজতেমা
ইরফান সাদিক, নতুন পয়গাম: রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হুগলির পুইনানের বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে অনেক ভয় ভীতি ছড়াচ্ছে কিছু তথাকথিত হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মুসলিমরা কোথাও একত্রিত হলেই নাকি হিন্দু খতরে মেঁ হ্যায় বলে ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে, যা শুনে হাস্যকর লাগলেও অনেক মানুষ নির্দ্বিধায় গিলে খাচ্ছে।
‘ইজতেমা’ শব্দের অর্থ সম্মেলন, ইংরেজীতে Conference বা Gathering বলা যেতে পারে। এই ইজতেমা বা সম্মেলন হিন্দু-মুসলিম সহ প্রায় প্রত্যেকটা ধর্মের মানুষদের হয়। কিন্তু তাতে কোনো ভয় বা আশঙ্কার প্রশ্ন ওঠেনি কোনোদিন। অধুনা মুসলিমদের জুমআর দিন ১৫ মিনিটের নামাযের জন্য, মাথায় টুপি দিয়ে চিড়িয়াখানা ঘোরা বা মাদ্রাসার ছেলেদের বাসে-ট্রেনে দেখলেই কিছু মানুষের ঘৃণ্য মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়, যা আমরা সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট বা ভিডিওর কমেন্ট বক্স দেখলেই বুঝতে পারি, কর্মহীন বেকারত্বে চারদিকে ঘৃণার দোকান খুলেছে, শুধু সুযোগ পেলেই চৈত্র সেলের মতো বিক্রি করে।
বর্তমান ধর্মের সংজ্ঞা এতটা সংকীর্ণ হয়েছে যে, অন্য ধর্মের উপাসনালয়ের সামনে হইচই কিংবা ব্যক্তির উপর আক্রমণ, অপমান না করলে ধর্ম বিপাকে পড়ে। অথচ যুগ যুগ ধরে শিবের মাথায় জল ঢালতে হাজারো মানুষের উপচে পড়া ঢল, ট্রেনে ঠাসাঠাসি ভিড়, কেউ কোনোদিন আপত্তি করেনি, জায়গায় জায়গায় হিন্দু ভাইয়েরা গেরুয়া বস্ত্র ধারণ করে গাড়িতে উল্লাসে শিব দর্শনে বের হত, তা দেখে আমরা উপভোগ করতাম। কিন্তু আপত্তি বা ঝামেলার পরিবর্তে সম্প্রীতি, সহাবস্থান, ঐক্যের চিত্রই ধরা পড়ে। কিন্তু আজকাল একই যাত্রা, একই সমাবেশ, একই ধর্মীয় বিশ্বাসকে মুসলিম সম্প্রদায়কে ভয় দেখানোর উপকরণে পরিণত করছে একদল ধর্ম ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ, তা খুব বেশি দেরি হওয়ার আগেই পুরনো পরিবেশকে ফিরিয়ে আনতে হবে; নচেৎ ক্ষতি হিন্দু-মুসলিম উভয়েরই। যার অর্থ দেশের অগ্রগতি নয়, ফের দেশভাগের করুণ চিত্রের পুনরাবৃত্তি কামনা।
জালসা, ইজতেমা, শিবযাত্রা, পূজা-পার্বণ যেমন হচ্ছে তেমনই হোক। যে যার ধর্ম বিশ্বাস মোতাবেক পালন করুক, এতে আপত্তির কিছু নেই। এই দেশ টিকে আছে পারস্পরিক নির্ভরতার উপর। দেশের প্রতিটি বড় উৎসব, বড় সমাবেশ আসলে একে অপরের সহযোগিতাতেই সফল হয়। দুর্গাপূজার মণ্ডপ পাহারা দেয় মুসলিম, ইজতেমার মাঠে জল, বিদ্যুৎ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে পাশে থাকে হিন্দু প্রতিবেশী, পুইনানে তাবলিগ ইজতেমা করতে জায়গা দিয়েছে অমুসলিম সহ-নাগরিকরা। রোজকার জীবনে আমরা একে অপরের উপর নির্ভর করেই বাঁচি, কিন্তু রাজনৈতিক কারণে সেই বাস্তব ছবিটা ইচ্ছে করে আড়াল করা হয়।
ঐক্য-সম্প্রীতি কোনো আদর্শবাদী স্লোগান নয়, এটি বাস্তব প্রয়োজন। যে সমাজে মানুষ ধর্ম দেখে নয়, মানুষ দেখে বিচার করে, সেই সমাজে উন্নয়ন সম্ভব। স্কুলে বাচ্চারা এক বেঞ্চে বসে পড়ছে, হাসপাতালে একসঙ্গে চিকিৎসা নিচ্ছে, মাঠে একসঙ্গে খেলছে, এই জায়গাগুলোতে ধর্ম কোনদিন বাধা হয়নি। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন বাইরে থেকে ঘৃণার আমদানি বা অনুপ্রবেশ করানো হয়।
ভারতের শক্তি তার বৈচিত্রে। এখানে ভিন্ন বিশ্বাস থাকবে, ভিন্ন পোশাক থাকবে, ভিন্ন প্রার্থনা থাকবে, ভিন্ন মত ও বিশ্বাস থাকবে — ভিন্নতাই আমাদের পরিচয়। আর একে ভয় নয়, সম্মানের চোখে দেখাই সভ্যতার পরিচায়ক। শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় সমাবেশকে যদি ঘৃণা-ভয় হিসেবে দেখানোর অপচেষ্টা হয়, তাহলে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তা মেনে নেবে না।
একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ মানে কাউকে সহ্য করা নয়; বরং একে অপরকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা। জালসা, ইজতেমা, শিবযাত্রা, পূজা-পার্বণ যেমন হচ্ছে, তেমনই হবে, এটাই ভারতের পরম্পরাগত ঐতিহ্য। এই স্বাভাবিকতাকেই রক্ষা করা আজ সবচেয়ে বড় দেশপ্রেম।








