মুখ্যমন্ত্রী ফিরতেই ডুয়ার্সে তিন বাগানে তালা, দিশেহারা শ্রমিক পরিবার
প্রীতিময় সরখেল
নতুন পয়গাম, জলপাইগুড়ি:
মুখ্যমন্ত্রী উত্তরবঙ্গ সফর শেষ করে ফিরতেই এক রাতের মধ্যে তালা ঝুলে গেল ডুয়ার্সের তিনটি চা-বাগানে। চামুর্চি, রেড ব্যাঙ্ক ও সুরেন্দ্রনগর চা-বাগানের শ্রমিকরা অভিযোগ করেছেন, বিনা নোটিশে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গেছে মালিক কর্তৃপক্ষ। পূজোর মুখে মজুরি-বোনাস না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি শ্রমিক পরিবার।
বৃহস্পতিবার রাতে প্রথমে চামুর্চি বাগানে বন্ধের খবর ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকরা জানান, মালিক পক্ষ বোনাস না দিয়েই চুপিসারে বাগান ছেড়ে চলে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বানারহাট ব্লকের রেড ব্যাঙ্ক ও সুরেন্দ্রনগর বাগান থেকেও একই অভিযোগ আসে। হঠাৎ একসঙ্গে তিন বাগান বন্ধ হয়ে যাওয়া ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়ায় এলাকায়। শ্রমিকদের দাবি, নিয়মিত মজুরি দেওয়াতেই ছিল টালবাহানা, পিএফ জমা হচ্ছিল না, এবার আবার পুজোর আগে বোনাস না দিতে গিয়েই পালিয়েছে মালিকরা।
শুক্রবার সকালে বকেয়া মজুরি ও বোনাসের দাবিতে রেড ব্যাঙ্ক বাগানের শ্রমিকরা বানারহাট–নাগরাকাটা জাতীয় সড়ক অবরোধ করে বসেন। একইসঙ্গে চামুর্চি বাগানের শ্রমিকরাও ভুটানগামী সড়কে অবরোধ শুরু করেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো এলাকা অচল হয়ে যায়। আটকে পড়ে বহু গাড়ি, ভুটানমুখী বিদেশি পর্যটকও পড়েন বিপাকে। স্পেন থেকে আসা পর্যটক আনা বলেন, “ভুটান যাচ্ছিলাম, দেখি অনেক মহিলা রাস্তা আটকে বসে আছেন। দুই ঘণ্টার বেশি আটকে থাকতে হয়। ওদের কষ্টের কথা শুনে চোখে জল এসে যায়।”
অবরোধে আটকে থাকা গাড়িগুলির সারি ক্রমশ দীর্ঘ হতে থাকায় বিপাকে পড়ে পুলিশ-প্রশাসনও। বানারহাট বিডিও নিরঞ্জন বর্মন, ধূপগুড়ির এসডিপিও গেইলসেন লেপচা ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। বিডিও জানান, “ঘটনার খবর পেয়ে আমি সেখানে গিয়েছিলাম। শ্রমিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, তবে আমাকে ঘিরে কোনও বিক্ষোভ হয়নি। আপাতত শ্রমিকদের জন্য জি-আর দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে, পাশাপাশি বিষয়টি জেলাশাসক ও শ্রম আধিকারিককে জানানো হয়েছে।”
চা শ্রমিক দীপাঞ্জলি থাপা বলেন, “অনেকদিন ধরেই বাগানে নিয়মিত মজুরি দেওয়া হচ্ছিল না। পিএফও ঠিকমতো জমা হচ্ছিল না। এবার বোনাস দেওয়ার আগে মালিক পালিয়ে গেল। তাই আমরা বাধ্য হয়েই রাস্তায় বসেছি।” অন্যদিকে শ্রমিক শিখা সরকারের বক্তব্য, “ঘরে খাবার চাল নেই। মজুরি মেলেনি, বোনাস তো দূরের কথা। এখন পরিবার নিয়ে আমরা দিশেহারা।”
চামুর্চি চা-বাগানের শ্রমিক নেতা গফফর আনসারি বলেন, “রাত নটার সময় আমরা জানতে পারি মালিক পালিয়েছে। সকালে গেটে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করি, পরে ভুটান সড়ক অবরোধ করি। আমাদের একটাই দাবি দ্রুত বাগান খোলা হোক।”
সকাল থেকে সাত ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অবরোধ চলার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসেন জলপাইগুড়ি জেলা পরিষদের সহকারি সভাধিপতি সীমা চৌধুরী। তিনি শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে আশ্বাস দেন, জেলাশাসকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং দুই দিনের মধ্যে মালিক পক্ষকে ডেকে বাগান খোলার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর মধ্যস্থতাতেই শেষমেশ শ্রমিকরা অবরোধ তুলে নেন।
তবে হঠাৎ করে তিনটি চা-বাগান বন্ধ হয়ে যাওয়া ঘিরে বড় প্রশ্ন উঠেছে। কেন মুখ্যমন্ত্রী উত্তরবঙ্গ সফর শেষ করেই এমন ঘটনা ঘটল? শ্রমিক সংগঠনগুলির দাবি, এটি মালিকদের পরিকল্পিত শ্রমিক-বিরোধী সিদ্ধান্ত, আর প্রশাসনের ব্যর্থতা এর সুযোগ করে দিয়েছে। পূজোর মুখে মজুরি ও বোনাস থেকে বঞ্চিত শ্রমিক পরিবারগুলি এখন কার্যত অনিশ্চয়তার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে।








