গ্রামীণ ও শহুরে দুর্গাপূজা: সেকালের সাবেকিয়ানা থেকে একালের চাকচিক্য
হাসান লস্কর, নতুন পয়গাম, দক্ষিণ ২৪ পরগনা:
দুর্গাপূজা বাঙালির কাছে কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ উৎসবের রূপ ও আয়োজন পাল্টেছে। বিশেষত গ্রামীণ ও শহুরে পূজার মধ্যে পার্থক্য আজ আরও স্পষ্ট।
সেকালের গ্রামীণ দুর্গাপূজা ছিল পারিবারিক ও সম্প্রদায়ভিত্তিক। জমিদারবাড়ি কিংবা নির্দিষ্ট কয়েকটি বাড়িতে পূজা হতো। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সেটি হয়ে উঠত পুরো গ্রামের মিলনমেলা। একচালার প্রতিমা, ডাকের সাজ, হাতে আঁকা চালচিত্র—সবকিছুতে থাকত ভক্তি, নিষ্ঠা ও সাবেকিয়ানা। দেবীর সামনে পশুবলিও ছিল প্রচলিত। পূজার সময় গ্রামের নারী-পুরুষ একসঙ্গে প্রতিমা সাজানো থেকে প্যান্ডেল নির্মাণ পর্যন্ত নানা কাজে হাত লাগাতেন। যাত্রাপালা, লোকনৃত্য ও নাটক মঞ্চস্থ হতো। হাতে তৈরি পোশাকেই খুঁজে নেওয়া হতো উৎসবের আনন্দ।
অতীতে শহরের পূজাও ছিল বনেদি বাড়ি ও ধনী পরিবারের নিয়ন্ত্রিত। সেখানে প্রতিমা আর প্যান্ডেলের সাজসজ্জায় থাকত আভিজাত্যের ছাপ। যদিও তখনও নিয়ম-নীতি ও ভক্তিই ছিল মূল আকর্ষণ, ধীরে ধীরে শহরে সর্বজনীন বা বারোয়ারি পূজার সূচনা হয়।
এখন চিত্র বদলে গেছে। গ্রামীণ দুর্গাপূজায় শহরের প্রভাব স্পষ্ট। পারিবারিক পূজা কমে গিয়ে বেড়েছে বারোয়ারি আয়োজন। পশুবলি ও কড়াকড়ি আচার কমে গিয়ে এসেছে ডিজে, মাইক, ঝলমলে আলোকসজ্জা ও থিমভিত্তিক প্রতিমা। পূজার বাজেট এখন গড়ে ওঠে চাঁদা আর স্পনসরশিপের ওপর।
অন্যদিকে শহরের দুর্গাপূজা এখন আর কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি হয়ে উঠেছে শিল্প, বাণিজ্যিকীকরণ ও সামাজিক বিনিময়ের এক বিশাল ক্ষেত্র। থিম, চমকপ্রদ প্যান্ডেল, চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে প্রতিদিন ভিড় জমায় হাজার হাজার মানুষ। কলকাতাসহ বড় শহরের পূজায় নামকরা শিল্পী আর আর্ট ডিরেক্টরদের অবদান এখন অনস্বীকার্য। পূজা ঘিরে গড়ে উঠেছে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড—নতুন পোশাক, উপহার, রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে ভ্রমণ পর্যন্ত সবই পূজার অঙ্গ।
গ্রামীণ পূজা আজও কিছুটা ঐতিহ্যনির্ভর, আর শহরের পূজা সম্পূর্ণ থিম ও শিল্পনির্ভর হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ পূজা মিলন ও ভালোবাসার প্রতীক, আর শহরের পূজা হয়ে উঠেছে দর্শন আর পর্যটনের কেন্দ্র। যেখানে গ্রামের পূজায় এখনও কিছুটা সরলতা ও আন্তরিকতা টিকে আছে, সেখানে শহরের পূজায় প্রতিযোগিতা, চাকচিক্য ও বাণিজ্যিকীকরণের ছাপ আরও স্পষ্ট।
মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা—পূজার দিনগুলো যেন সবার জীবনে সুখ, শান্তি আর আনন্দে ভরে ওঠে।







