শীতে বাঘের লোকালয়ে প্রবেশের কারণ ও প্রতিকার
হাসান লস্কর বাবলু
নতুন পয়গাম, সুন্দরবন:
রয়েল বেঙ্গল টাইগার—সুন্দরবনের গর্ব। জাতীয় পশু বাঘ সাধারণত মানুষের বসতি এড়িয়ে চলে। কিন্তু শীতের মরসুমে প্রায়ই দেখা যায় বাঘ লোকালয়ে চলে আসছে। ফলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বন্যপ্রাণীও। কুলতলির গৌড়ের চক, কিশোরী মোহনপুর বা দেউলবাড়ির গঙ্গাঘাটের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি তার উদাহরণ।
বনকর্মীদের মতে, শীতকালে বাঘের প্রধান শিকার—হরিণ, বুনো শুয়োর ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী—খাবারের খোঁজে বনের গভীরে চলে যায়। এতে বাঘের খাদ্যাভাব দেখা দেয়। ক্ষুধার্ত বাঘ তখন সহজলভ্য খাদ্যের খোঁজে লোকালয়ের কাছাকাছি আসে, যেখানে গরু, ছাগল বা কুকুরের মতো গৃহপালিত পশু সহজেই পাওয়া যায়।
শীতের ঠান্ডা থেকে বাঁচতে উষ্ণ ও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়ের পাশে কোনো পরিত্যক্ত স্থানও বাঘের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। প্রজননের সময় অনেক সময় বাঘ লোকালয়ের কাছাকাছি ঘন ঝোপঝাড়ও বেছে নেয়।
বনভূমির পরিধি ক্রমশ কমে যাওয়া, নদীগর্ভে জঙ্গল বিলীন হওয়া, মাছের ভেড়ি বসিয়ে বনভূমি দখল—এই সব কারণে বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নগরায়নের চাপও বাঘদের বাধ্য করছে নতুন স্থানের খোঁজে বেরোতে। বন বিভাগের হিসেব অনুযায়ী, গত নভেম্বর থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৮ বারের বেশি বাঘ লোকালয়ে ঢুকেছে।
বনের ভেতরে কাঠ কাটা, পশুপালন, পর্যটকদের যন্ত্রচালিত নৌকার শব্দ বা মৃত প্রাণীর দেহ ফেলে রাখা—এসব অনিয়ন্ত্রিত কাজ বাঘকে বিরক্ত করে, যার ফলেও তারা বাসস্থান ছেড়ে বাইরে চলে আসে। অসুস্থ বা বয়স্ক বাঘও লোকালয়ে ঢোকার প্রবণতা দেখায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঘ লোকালয়ে এলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত বনদপ্তরকে খবর দেওয়া উচিত। গ্রামবাসীদের বাঘের আচরণ ও তাকে শান্ত রাখার উপায় সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি।
প্রতিরোধের উপায় হিসেবে বনভূমি ধ্বংস বন্ধ করা, বাঘের প্রাকৃতিক শিকারের সংখ্যা বজায় রাখা, বন-লোকালয়ের মাঝে বাফার জোন তৈরি করা, ক্যামেরা ট্র্যাপ ও জিপিএসের মাধ্যমে বাঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ—এসব ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া দলের (র্যাপিড রেসপন্স টিম) মাধ্যমে বাঘকে শান্ত করে আবার বনে ফেরানো এবং বননির্ভর মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাঘ ও মানুষের সংঘাত যে শুধু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সমস্যা নয়, তা এখন স্পষ্ট। এই সংঘাত কমাতে হলে মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, সচেতনতা বৃদ্ধি ও বাঘের আবাসস্থল রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তবেই সুন্দরবনের বাঘ ও মানুষ—দু’পক্ষই নিরাপদে সহাবস্থান করতে পারবে।








