মণিপুরের পাঙ্গাল মুসলিম সম্প্রদায় কারো পক্ষে বা বিপক্ষে নয়, তারা শুধু শান্তির পক্ষে
নতুন পয়গাম, ইম্ফল, ১৪ সেপ্টেম্বর:
উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে গত প্রায় আড়াই বছর ধরে চলা রক্তাক্ত জাতিদাঙ্গার মাঝখানে পড়ে তিন লক্ষাধিক ‘পাঙ্গাল’ মুসলিম জেরবার হচ্ছে। ২০২৩ সালের ৩ মে থেকে মণিপুরে কুকি বনাম মেইতেই জাতিদাঙ্গা শুরু হলে তার কয়েক মাস পর মণিপুরের পাঙ্গাল মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতারা জানান, রাজ্যের বিবদমান দুটি গোষ্ঠী – মেইতেই এবং কুকি-জোমি উভয়েই এখন তাদের অবিশ্বাস করতে শুরু করেছে এবং তারা দু’তরফ থেকেই হামলার আশঙ্কায় ভুগছেন। সেই সময় পাঙ্গালদের সংযুক্ত কমিটি দিল্লি গিয়ে মণিপুরের জন্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেন, যাতে তারা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
কমিটির মুখপাত্র মহম্মদ রইস আহমেদ টাম্পাক বলেন, “মণিপুর এখন পুরোপুরি যুদ্ধক্ষেত্রর চেহারা নিয়েছে! আর পাঙ্গাল মুসলিমরা রাজ্যের যেখানে থাকেন সেটাকে বলা যেত পারে ওই যুদ্ধের বাফার জোন। কারণ, আমাদের বসবাস মেইতেই আর কুকি-জোমি অধ্যুষিত এলাকার ঠিক সীমান্তে। এখন এই সংঘাতে আমরা কারো পক্ষ না-নিয়ে শান্তি ফেরানোর কথা বলছি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে আমরা একরকম ‘ফাটা বাঁশে আটকে গেছি’। রইস আহমেদ অল্প অল্প বাংলা জানেন বলে এই শব্দ বন্ধের সঙ্গে পরিচিত। মণিপুরের মেইতেই অধ্যুষিত বিষ্ণুপুর ও কুকি অধ্যুষিত চূড়াচাঁদপুর জেলার সীমান্তবর্তী কোয়াকটা শহরেই পাঙ্গাল মুসলিমরা সবথেকে বেশি বিপদে পড়েছেন। এই কোয়াকটাতে ৯০ শতাংশেরও বেশি মুসলিমের বসবাস, যাদের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কোনও সম্পর্ক নেই। অথচ তাদেরকেও হামলার ভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যেতে হচ্ছে বলে জানান ‘ইউনাইটেড মেইতেই পাঙ্গাল কমিটি’-র মুসলিম নেতৃত্ব। রাজ্যের মোট জনসংখ্যার দশ শতাংশের কাছাকাছি এই পাঙ্গাল মুসলিমরা। এরা
নিজেদের মেইতেই বলেই মনে করেন। উল্লেখ্য, মেইতেইরা মূলত হিন্দু এবং কুকিরা মূলত খ্রিস্টান। যদিও অতীতে হিন্দু মেইতেই ও পাঙ্গাল মুসলিমদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়েছে।
১৯৯৩ সালে রাজ্যের থৌবাল জেলায় এমনই এক সাম্প্রদায়িক হামলায় শতাধিক পাঙ্গাল মুসলিমের প্রাণহানি হয়েছিল। এবারের মেইতেই-কুকি সংঘর্ষে পাঙ্গালরা যাতে কোনওভাবে জড়িয়ে না-পড়েন, তাদের সম্প্রদায়ের নেতারা সে ব্যাপারে প্রথম থেকেই খুব সতর্ক ছিলেন।
তারা বলছেন, সংঘাতদীর্ণ রাজ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা আগাগোড়া কাজ করে আসছেন। কুকি বা মেইতেই কারও পক্ষ নিয়েই তারা কোনও বিবৃতি দেননি। তারা কেবল শান্তি ফেরানোর কথা বলে চলেছেন। কিন্তু জাতিদাঙ্গা শুরুর মাস চারেক পরে দেখা যায় পাঙ্গালরাও রোষে পড়েন। তাদের ওপরেও কোথাও কোথাও হামলা হয়। ৬ আগস্ট ২০২৩ পাঙ্গাল অধ্যুষিত কোয়াকটা শহরে তিন হিন্দু মেইতেইকে হত্যা করে কুকিরা। মেইতেইরা সন্দেহ করে, পাঙ্গালরাই বোধহয় এই হত্যাকান্ডে কুকি-জোমিদের সাহায্য করেছে। মুসলিমদের ওপর হুমকি আসতে থাকলে প্রাণে বাঁচতে কোয়াকটা শহরের খুব কাছেই লেইথান গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যায় পাঙ্গাল মুসলিমদের একাংশ।
সেই খালি গ্রামের দখল নিয়ে সশস্ত্র মেইতেই গোষ্ঠীগুলো সেখানে তাদের ঘাঁটি গড়ে তোলে এবং সেখান থেকে চূড়াচাঁদপুরে কুকিদের ওপর হামলা চালানো হতে থাকে। এরপর খ্রিষ্টান কুকি-জোমিরাও মনে করতে শুরু করে, পাঙ্গাল মুসলিমরা নিশ্চয় মেইতেইদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাদের ওপর হামলার পরিকল্পনা আঁটছে। এমতাবস্থায় পাঙ্গাল মুসলিম সংগঠন ইউএমসিপি-র আহ্বায়ক মাওলানা মহিয়ুদ্দিন বলেন, “রাজ্য জুড়ে যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির রমরমা শুরু হয়েছে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা পাঙ্গালরাও তার শিকার হচ্ছি।”
তাঁর কথায়, বিভিন্ন জাতি-ধর্মের লোকজনের বসবাসের কারণে যে মণিপুরকে এক সময় ‘মিনি ইন্ডিয়া’ বলে লোকে চিনত, ধর্মীয় বিভাজনের কারণে সেই মিথ আজ নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র রাজনীতির কারণে। এসব কথা রাষ্ট্রপতি ও কেন্দ্র সরকারের কাছে পৌঁছে দিতেই এবং মণিপুরে শান্তি ফেরানোর আর্জি জানিয়ে তাঁরা স্মারকলিপি তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-র কার্যালয়ে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ও জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশনের হস্তক্ষেপ দাবি করেও তারা স্মারকলিপি জমা দেন। ১৮ অগাস্ট ২০২৩ ইউএমসিপি নেতারা দিল্লির ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলনও করেন। সেই থেকেই মণিপুরী মুসলিমদের দিকে মিডিয়ার নজর পড়তে শুরু করেছে।
মণিপুরের পাঙ্গাল মুসলিমদের ইতিহাস:
ভারতের মণিপুরে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা যে বেশ কয়েকশো বছর ধরে বসবাস করছেন, ইতিহাসই তার সাক্ষ্য দেয়। মণিপুরে প্রথম বড় আকারে মুসলিম বসতির সূত্রপাত সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ায়, যখন আজকের বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চল থেকে এক বিরাট মুসলিম সৈন্যবাহিনী মণিপুরের তৎকালীন রাজা খাগেম্বার (১৫৯৭–১৬৫২) রাজত্বে হামলা চালিয়েছিল। তখন অবশ্য ওই রাজত্বের নাম ছিল কাংলেইপাক। রাজা খাগেম্বা সেই যুদ্ধে জিতলেও পরাজিত মুসলিম সেনাদের তার রাজত্বে বসতি স্থাপন করার অনুমতি দিয়েছিলেন। সেই সুবাদেই মণিপুরে ইসলামের প্রবেশ। পরে মণিপুরের মুসলিমরা ধীরে ধীরে ধীরে ওই এলাকার মূল ধারার জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যায়। রাজা খাগেম্বার সেনাবাহিনী ও প্রশাসনেও তারা অনেকেই চাকরি করতেন।
অষ্টাদশ শতকে বার্মা কিংবা ঊনিশ শতকে ব্রিটিশ বাহিনী মণিপুরে যে অভিযান চালিয়েছিল, তা রুখে দিতে রাজ্যের মুসলিম সৈন্যরা বড় ভূমিকা রেখেছিলেন বলে গবেষকরা জানাচ্ছেন। তবে মণিপুরের মুসলিমরা কীভাবে ‘পাঙ্গাল’ নামে পরিচিত হল, তার উৎস নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে দ্বিমত আছে। কেউ কেউ বলেন, পাঙ্গাল শব্দটি এসেছে ‘মাঙ্গাল’ থেকে, যেটি বাদশাহী ‘মুঘল’ শব্দের একটি স্থানীয় অপভ্রংশ। আবার কোনও কোনও গবেষক মনে করেন, পাঙ্গাল কথাটি এসেছে ‘বঙ্গাল’ বা বাংলা থেকে।
কারণ, একদা ওই অঞ্চল থেকে এসেই বেশিরভাগ মুসলিম মণিপুরে এসেছিলেন। তবে নামকরণের উৎস যা-ই হোক, পাঙ্গালরা আজ যে মণিপুরের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাতে কোনও সন্দেহ-সংশয় নেই। পর্যবেক্ষকরা বলেন, ৬০ আসনের মণিপুর বিধানসভায় অন্তত ১৮টি আসনের ফলাফল প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখেন পাঙ্গালরা। রাজ্যে এই মুহুর্তে তিনজন পাঙ্গাল মুসলিম বিধায়ক আছেন, প্রশাসন বা পুলিশেও তারা অল্প হলেও কাজ করেন। পাঙ্গাল মুসলিমদের বক্তব্য হল, ”জনসংখ্যার মাত্র আট-নয় শতাংশ হয়ে আমরা নিশ্চয় ৫০ শতাংশ হিন্দু বা ৪০ শতাংশ খ্রিষ্টানদের সঙ্গে লড়াই করতে যাব না! বরং আমরা জাতিদাঙ্গার শুরু থেকেই কোয়াকটা অঞ্চলে ত্রাণ শিবির চালাচ্ছি, দুর্গতদের আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করছি। আমরা কারও পক্ষে নই, কারো বিপক্ষেও নই, আমরা কেবল শান্তির পক্ষে!”








