এক সাইকেল, এক মানুষ, এক প্রতিশ্রুতি: কালিয়াচকের মুকুলদার গল্প
এম নাজমুস সাহাদাত, নতুন পয়গাম, মালদহ:
ঘড়ির কাঁটা ভোর ছুঁই-ছুঁই। মানুষ তখনও ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু দক্ষিণ রায়পুর থেকে একটি পরিচিত সাইকেল ঠিক সেই সময়েই ছুটে বেরিয়ে পড়ে কালিয়াচকের বিভিন্ন ওলি-গলি, পাড়া ও গ্রামমুখে। সাইকেলের ঝুড়ি ভর্তি খবরের কাগজ আর সঙ্গে মানুষটির মুখে অটল দৃঢ়তা তিনি মুকুলদা। এলাকায় নাম উচ্চারিত হলেই মানুষ বলেন, “ওই তো আমাদের মুকুলদা কালিয়াচকের ভোরের মানুষ। ১৯৯৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর সামান্য হাতখরচ জোগাতে তিনি শুরু করেন সংবাদপত্র বিলি করার কাজ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কাজই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অংশ, তাঁর পরিচয়ের আলো। সামান্য দিনের চাকরি নয় এটাই তাঁর ভালোবাসা। আর তাই টানা ৩৩ বছরে একদিনও নিয়ম ভাঙেননি, এমনটাই জানাচ্ছেন স্থানীয় মানুষ। সূত্রের খবর, প্রতিদিন সকাল চারটের মধ্যেই বাড়ি থেকে বের হয়ে পড়েন তিনি। দক্ষিণ রায়পুর, মোজমপুর, কালিয়াচকের বাজারসংলগ্ন এলাকা থেকে শুরু করে নানাবাড়ি, মথুরাপুর, বালিয়াডাঙা গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে ছড়িয়ে দেন রোজকার খবর। ঝড়-বৃষ্টি বা তীব্র গরম কিছুই তাঁকে থামাতে পারে না।
মুকুল শেখের ভাষায়, মানুষ সকালবেলা খবরের অপেক্ষায় থাকে। আমি দেরি করলে তাদের দিনের শুরুটাই খারাপ হয়ে যায়। তাই যতই কষ্ট হোক, কাজটা আমি ঠিকমতো করতে চাই। একই পেশায় ২৯ বছরেরও বেশি সেবা যেখানে আজকের দিনে পেশা বদলানো সাধারণ বিষয়, সেখানে একই কাজে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এই দৃঢ়তা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। টানা ২৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে একই পেশায়, একই উৎসাহে কাজ করে চলেছেন তিনি। তাঁর কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও সততা আজও অপরিবর্তিত। মুকুলদা শুধু একজন সংবাদপত্র-বাহক নন, তিনি সময়নিষ্ঠার প্রতীক। তাঁর সাইকেলের চাকার শব্দ শুনে বহু বাড়িতে ঘুম ভাঙে। এলাকার এক গ্রাহক জানান, আমি ২৫ বছর ধরে ওনার কাছ থেকে কাগজ নিচ্ছি। একদিনও ভুল সময় আসতে দেখিনি। এমন পরিশ্রমী মানুষ আজকাল দেখা যায় না।
এক কলেজ ছাত্রী জারা ফাতেমার বক্তব্য, আমার বাবা জীবিত থাকাকালেও ওনার কাছ থেকে কাগজ নিতেন। এখনো সময়মতো কাগজ পেয়ে মনে হয় ভোরের সঙ্গে একটা পুরোনো সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। কালিয়াচক বাজার সংলগ্ন এলাকার হাসিবুল শেখ জানান, বৃষ্টি হোক বা আমফানের মত ঝর মুকুলদাকে কখনও বাদ দিতে দেখিনি। মানুষের প্রতি তাঁর যেটা দায়িত্ব তাতে একটুও ফাঁকি নেই। প্রতিবেশীরা আরও জানান, মুকুলদা খুবই সৎ স্বভাবের। কারও কাছে বাড়তি পয়সা নেন না, ভুলে বেশি টাকা দিলে ফিরিয়ে দেন। আর সবচেয়ে বড় কথা কখনই কারও সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলেন না। একমাত্র সাইকেলই তাঁর সঙ্গী। দক্ষিণ রায়পুর থেকে বের হওয়া সেই সাইকেলটি যেন তাঁর জীবনসঙ্গী। সাইকেলটি বহু বছর পুরোনো হলেও এখনও তাঁরই ভরসা। সেই সাইকেলই দেখেছে তাঁর জীবনসংগ্রাম, তাঁর ভালোবাসা, তাঁর দায়িত্ব পালন। মুকুলদার মুখে শোনা যায়, এই সাইকেলটা আমার পরিবারের মতো। যতদিন পারব, এর ওপর ভরসা করেই মানুষের দরজায় পৌঁছে দেব খবর। গোলাপগঞ্জের যুবরাজ ত্রিবেদী বলেন, সমাজে কত নামিদামি মানুষ থাকেন, কত বড় পদে কাজ করেন কিন্তু অনেক সময় ছোট কাজের পিছনে থাকা মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না। অথচ তাঁদের শ্রমেই দাঁড়িয়ে থাকে সমাজের প্রতিদিনের চলাচল। মুকুলদা সেই সকল মানুষেরই প্রতিনিধি, যাঁরা পরিচিত নন আলোয়, পরিচিত নন প্রচারে; কিন্তু মানুষের জীবনে তাঁদের অবদান বিরাট।
স্থানীয় এক স্কুল শিক্ষক বলেন, আমরা ছাত্রছাত্রীদের সামনে উদাহরণ হিসেবে মুকুলদার কথা বলি। কারণ সততা, নিয়ম, আর পরিশ্রম এই তিনটি গুণ তাঁর মধ্যে একসাথে দেখা যায়। সবার ভালোবাসায় ভরসা পান তিনি। দীর্ঘসময়ের এই সেবা তাঁকে এলাকার মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে দিয়েছে। তাঁর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও স্নেহ চোখে পরার মতো। কেউ কেউ বলেন, “মুকুলদা না এলে যেন দিনটাই ঠিকমতো শুরু হয় না।” আজও মানুষ তাঁকে দেখেই বলেন “সুপ্রভাত মানেই মুকুল’দা।”
কালিয়াচকের মানুষ আজও তাঁর সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি শুনেই বোঝেন দিনের শুরু। একটি ছোট্ট পেশা, কিন্তু তার ভেতর কত বড় দায়িত্ব, কত ভালোবাসা, কত মানুষের প্রতি কমিটমেন্ট মুকুলদা প্রতিদিন সেটা প্রমাণ করে চলেছেন।
পরিচিত সকলের বক্তব্য, তিনি সুস্থ থাকুন নিমগাছের মতো দৃঢ় হয়ে। তাঁর সাইকেল চলতে থাকুক আরও বহু বছর ধরে। তার পথচলা চলুক ঠিক সেই ১৯৯৪ সালের ভোরের মতোই। মুকুলদার মতো মানুষই সমাজকে সুন্দর থাকে। কালিয়াচকের মানুষ তাই গর্ব করে বলেন, মুকুলদা আছে বলেই আমাদের ভোরটা এখনো মানবিক।







