একসময় রেশমের ঘ্রাণে ভরা ছিল কালিয়াচক-মোথাবাড়ি, এখন তুতপাতা বিক্রি হচ্ছে গরুর খাবার হিসেবে
আবু রাইহান, নতুন পয়গাম, কালিয়াচক:
আজ যেই তুতপাতা একসময় রেশম পলুর একমাত্র খাদ্য ছিল, সেই তুতপাতাই গবাদিপশুর খাবার হিসেবে বিক্রি হচ্ছে মোথাবাড়ির পাগলা ব্রিজের ধারে। তুতপাতা বোঝাই করে বিক্রি হচ্ছে অল্প দরে। গরু ও ছাগল পালনকারীরাই এখন এই পাতার প্রধান ক্রেতা।
একসময় সমগ্র রাজ্যে মালদা জেলা রেশম চাষের জন্য বিখ্যাত ছিল। “রেশমের মালদা” নামেই পরিচিত ছিল এই জেলা। কালিয়াচক ও মোথাবাড়ি এলাকা ছিল রেশম চাষের মূল কেন্দ্র। গঙ্গা অববাহিকার উর্বর জমিতে সারি সারি তুত গাছ—এই দৃশ্যই ছিল একসময়ের বাস্তব চিত্র। প্রতিটি ঘর থেকেই উঠত রেশম গুটির মিষ্টি গন্ধ, প্রতিটি পরিবারই ব্যস্ত থাকত তুতপাতা সংগ্রহ ও রেশম পলু পালনে।
তবে এখন সেই চিত্র অনেকটাই অতীত।
মোথাবাড়ির কাহালা গ্রামে একসময় প্রায় ১২০০টি ঘরেই রেশম চাষ হতো। এখন সেখানে হাতে গোনা চার-পাঁচটি পরিবারই এই ঐতিহ্যবাহী পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
স্থানীয় চাষি নুরজাহান শেখ বলেন,
“একসময় বছরে চারবার পলু পালন করতাম। এখন আর সেই উৎসাহ নেই। রেশম গুটির দাম পাই না, খরচ বেশি—তাই বাধ্য হয়ে তুতপাতা গরুর খাবার হিসেবে বিক্রি করি।”
রেশম চাষের অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে উৎপাদনের তুলনায় বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়া। চাষিরা জানাচ্ছেন, পলু পালনে প্রচুর পরিশ্রম ও যত্নের প্রয়োজন, কিন্তু বিনিময়ে মেলে না উপযুক্ত লাভ। ফলে ধীরে ধীরে চাষিরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন রেশম চাষ থেকে। অন্যদিকে, তুত জমিগুলোতেও ঘটছে পরিবর্তন। অনেকেই তুতগাছ কেটে সেখানে আম, লিচু বা অন্যান্য বাণিজ্যিক ফসলের চাষ শুরু করেছেন। কারণ তাতে লাভ বেশি এবং ঝুঁকি কম। একসময় এই এলাকায় রেশম গুটির মৌসুম মানেই ছিল উৎসবের আমেজ—প্রতিটি পরিবার একসঙ্গে ব্যস্ত থাকত ডিম থেকে গুটি তৈরি পর্যন্ত প্রায় এক মাসব্যাপী কর্মযজ্ঞে। এখন সেই চিত্র বিলুপ্ত।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা সফিকুল সেখ বলেন, “ছোটবেলায় দেখেছি, প্রতিটা জমিতে তুতপাতা সারি সারি ভাবে চাষ হতো, পলু পালন নিয়ে উৎসবের পরিবেশ থাকত। এখন সেই দিনগুলো শুধু স্মৃতি।”
রেশম চাষ একসময় মালদার অর্থনীতির অন্যতম ভরকেন্দ্র ছিল। বহু পরিবার এই চাষের উপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামোর অভাব, সরকারি উদাসীনতা এবং বাজারের অনিশ্চয়তা রেশম চাষকে কোণঠাসা করে তুলেছে।
তবুও, এখনও কিছু মানুষ আছেন যারা পূর্বপুরুষের এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে মরিয়া। তাদেরই প্রচেষ্টায় এখনো কিছু ঘরে পলু পালন হয়, কিছু তুতগাছ এখনো সবুজ হয়ে আছে স্মৃতির মতো।
তারা আশা করেন—যদি সরকারি উদ্যোগ ও প্রণোদনা পাওয়া যায়, তাহলে আবারও মালদা জেলার সেই পুরনো ঐতিহ্য ‘রেশম চাষ’ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।







