মাদ্রাসা থেকে জাতীয় সাফল্য UPSC-এ নজির মুর্শিদাবাদের সানা আজমির
নতুন পয়গাম, এম নাজমুস সাহাদাত: পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জেলাগুলির তালিকায় প্রায়ই প্রথম সারিতেই থাকে মুর্শিদাবাদ। সাক্ষরতার হার থেকে শুরু করে শিক্ষার পরিকাঠামো বিভিন্ন সূচকে এখনও এই জেলার অনেকটাই পথ চলা বাকি। কিন্তু সেই মুর্শিদাবাদ থেকেই উঠে এসে দেশের সবচেয়ে কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলির একটি UPSC সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করে নজির গড়লেন সাগরদিঘি ব্লকের কৃতি কন্যা সানা আজমি। সর্বভারতীয় তালিকায় ৭৬৪তম স্থান অর্জন করে তিনি শুধু নিজের পরিবার নয়, গোটা রাজ্যকেই গর্বিত করেছেন। মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত গ্রাম কাবিলপুর অঞ্চলের পাঁকালপাড়া সেখানেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা বছর পঁচিশের এই তরুণীর। গ্রামের মাটির গন্ধে বড় হয়ে ওঠা সানা আজমি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং অধ্যবসায়ী। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, আর্থিক টানাপোড়েন এবং সামাজিক নানা বাধা সত্ত্বেও তিনি নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। আর সেই স্বপ্নই তাঁকে পৌঁছে দিল দেশের প্রশাসনিক পরিষেবার দরজায়।
২০২৫ সালের UPSC সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হতেই সামনে আসে তাঁর এই সাফল্যের খবর। ফল ঘোষণার পর বর্তমানে দিল্লিতে থাকা সানা প্রথমেই ফোন করে সুখবরটি জানান নিজের পরিবারকে। খবরটি পৌঁছতেই আনন্দে ভরে ওঠে কাবিলপুর গ্রাম। মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে খুশির আবহ। সানার শিক্ষাজীবনের শুরু স্থানীয় বিদ্যালয় থেকেই। কাবিলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন তিনি। এরপর উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে ভর্তি হন আল-আমীন মিশনে। সেখান থেকেই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। আল-আমীন মিশনের শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবেশ এবং প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা তাঁর জীবনের লক্ষ্যকে আরও সুস্পষ্ট করে তোলে। এরপর বড় স্বপ্নকে সামনে রেখে তিনি পাড়ি দেন দেশের রাজধানী দিল্লিতে। সেখানে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে ভর্তি হয়ে ২০২৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও সম্পন্ন করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি শুরু হয় তাঁর সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার কঠিন প্রস্তুতি। দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত অধ্যবসায়, পরিকল্পিত পড়াশোনা এবং অদম্য মনোবলের জোরেই তিনি প্রথমবার পরীক্ষায় বসেই এই উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন।
সানা আজমির সাফল্যের গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তাঁর পারিবারিক পটভূমি। তিনি এক সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা মাইজুদ্দিন শেখ পেশায় একজন কৃষক। সংসারে সাত মেয়ে ও তিন ছেলের বড় পরিবার। সীমিত আয়ের মধ্যেই সন্তানদের মানুষ করার সংগ্রাম ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা। তবুও শিক্ষার প্রতি অগাধ বিশ্বাস ছিল মাইজুদ্দিন শেখের। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা মানুষকে জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি দেয়। রোদ, বৃষ্টি, ঝড় উপেক্ষা করে মাঠে-ঘাটে অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনি সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে গিয়েছেন। সেই কঠোর পরিশ্রমের ফল আজ সানার সাফল্যের মধ্য দিয়ে ধরা পড়েছে। মাইজুদ্দিন শেখ বলেন,আমি একজন সাধারণ কৃষক। সংসারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। কিন্তু আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি শিক্ষা মানুষের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। সেই বিশ্বাস থেকেই সন্তানদের পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আজ মেয়ের এই সাফল্যে আমরা সবাই খুব খুশি। পরিবারের অন্য সদস্যরাও সানার অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর বড় দিদি বিউটি খাতুন ইতিমধ্যেই একজন চিকিৎসক (এমডি)। আরেক দিদি ডালিয়া মৌসুমি বর্তমানে এমবিবিএস পড়ছেন। পরিবারের এই শিক্ষার পরিবেশ সানাকে আরও বড় স্বপ্ন দেখতে সাহস জুগিয়েছে।








