ভারত বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন
নতুন পয়গাম, এম.রহমান, আহমেদাবাদ: ১৯ নভেম্বর ২০২৩ নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে মাথা নীচু করে মাঠ ছেড়েছিল ভারত। ৮ ই মার্চ ২০২৬, সেই মাঠেই মাথা উঁচু করে মাঠ ছাড়লেন সূর্যকুমার যাদবরা। নিউজিল্যান্ডকে ৯৬ রানে উড়িয়ে দিয়ে ফের ক্রিকেট বিশ্বে শ্রেষ্ঠ ভারত। এ যেন অপার্থিব অনুভূতি, অবিশ্বাস্য রোমাঞ্চ! কুড়ি ওভারের বিশ্বকাপ জিতে ভারত ইতিহাস ‘তৈরি’ এবং ‘পুনরাবৃত্তি’— দুই করল। অতীতে কোনও দল টানা দু’বার এই আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়নি। ভারতই নজির গড়ল। তিন-তিনবার এই আসরে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা আর কারও নেই। ঘরের মাঠে কাপ জয়ে সেই অধরা মাধুরীও এখন হাতের মুঠোয়। রবিবারের সবরমতীর শহর তাই হয়ে উঠল রূপকথার।
মোতেরা অবশ্য ফুটছিল সকাল থেকেই। প্রেসবক্সেও অদ্ভুত সব ফ্রেম। শ্রীলঙ্কান সাংবাদিক পরে এসেছেন সবুজ রঙের পাঞ্জাবি। দক্ষিণ ভারতীয় একজনের পরনে ঐতিহ্যবাহী সবুজ ধুতি। সঞ্জুর প্রতিটা শট, কিউয়িদের প্রতিটা উইকেট সেলিব্রেট হচ্ছিল তুমুল হাততালিতে। যেন প্রত্যেকের পরনেই টিম ইন্ডিয়ার নীলরঙা জার্সি। ঠিক মাঠে হাজির ৮৬ হাজার দর্শকের মতোই। ম্যাচটা শুরুও হয়েছিল উৎসবের মেজাজে। ক্রিকেটপ্রেমীদের শব্দব্রহ্মকে ইন্ধন জুগিয়ে অভিষেক শর্মা ও সঞ্জু স্যামসন শুরু করেন ধুমধাড়াক্কা। চলতি আসর জুড়েই মিইয়ে ছিলেন অভিষেক। অফ স্পিনের শিকার হচ্ছিলেন নিয়ম করে। ফাইনালেই জ্বলে উঠলেন। নিউজিল্যান্ড অবশ্য মাঠেই নেমেছিল অফ স্পিনারকে বাদ দেওয়ার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়ে। পার্টটাইম অফ স্পিনার গ্লেন ফিলিপসকেও তো এক ওভারের বেশি বল দেওয়া হল না। এর ফায়দা নিতে ভুল হয়নি অভিষেকের। ভয়ডরহীন আগ্রাসনে ১৮ বলে পৌঁছান পঞ্চাশে। সেটাই গড়ল রানের প্রাসাদের ভিত।
তারপর খেলাটা ধরলেন সঞ্জু স্যামসন। নক-আউটে টানা তিনটি ম্যাচে হাফ-সেঞ্চুরি, এদিনও হাতছাড়া শতরান। কে বলবে সুপার এইটের শুরুতে এই মাঠেই তাঁর ঠিকানা ছিল ডাগ-আউট। কোনও সন্দেহ নেই, ৩১ বছর বয়সি কেরালাইটই কাপযুদ্ধে কঠিন সময়ের পরিত্রাতা। ৪৬ বলে এল ৮৯, বিশ্বকাপ ফাইনালে যা রেকর্ড। শৃঙ্খলাজনিত কারণে বছর দুয়েক নির্বাসন কাটিয়ে ফেরা ঈশান কিষানও ভরসা জোগালেন। ২৫ বলে সংগ্রহে ৫৪। দ্বিতীয় উইকেটে সঞ্জু-ঈশানের মারকাটারি মেজাজে ৪৮ বলে উঠল ১০৫। তখন তিনশোর আশাই ডালপালা মেলছে। ১৬তম ওভারে জেমস নিশামের তিন ধাক্কা অবশ্য থামাল অগ্রগতি। তবে শেষ ওভারে শিবম দুবের দাপটে আড়াইশোর গণ্ডি টপকাতে অসুবিধা হয়নি। সেমি-ফাইনালের চেয়েও দু’রান বেশি ওঠে বোর্ডে। ব্ল্যাক ক্যাপসদের তখনই হাল ছেড়ে দেওয়া লাগছিল।
ফাইনালের মতো প্রেসার কুকার পরিস্থিতিতে ২৫৬ রানের টার্গেট এমনিতেই ধরাছোঁয়ার বাইরে দেখায়। শুরুতে তাণ্ডব না হলে তা আলোকবর্ষ দূরে সরতে থাকে।
কিউয়িরা অবশ্য পাওয়ার প্লে’র মধ্যেই ফিন অ্যালেন (৯), রাচীন রবীন্দ্র (১), গ্লেন ফিলিপসকে (৫) হারিয়ে ধুঁকতে লাগলেন। আস্কিং রেট তখন চড়চড় করে আকাশ ছোঁয়ার পথে। টিম সেইফার্ট (৫২) মরিয়া চেষ্টা করলেন বটে, কিন্তু পার্টনারশিপ হল কোথায়? বাকিরা শুধুই এলেন আর গেলেন। শেষের দিকে বড় রানের হার থেকে লজ্জা এড়াতে স্যান্টনার (৪৩) মাটি আঁকড়ে থাকলেন। ভারতের হয়ে বল হাতে দাপট দেখালেন যশপ্রীত বুমরাহ (৪-১৫)। তাঁর বিষাক্ত ছোবলের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করলেন কিউয়ি ব্যাটাররা। সেই সঙ্গে দেশের জার্সিতে টি-২০ ক্রিকেটে সেরা বোলিং পারফরম্যান্স মেলে ধরলেন ‘বুমবুম’। আর এক ঘরের ছেলে ‘বাপু’ অক্ষরও (৩-২৭) থাকলেন নিশানায় অভ্রান্ত। তবে বরুণ চক্রবর্তী এদিনও কৃপণ হতে ব্যর্থ। নিউজিল্যান্ড শেষ পর্যন্ত কেঁদে-কঁকিয়ে তুলল ১৫৯। খান তিনেক ক্যাচ না ফসকালে অবশ্য আগেই পড়ত যবনিকা। তবে গ্যালারিতে বিশ্বজয়ের উৎসব শুরু হয়েছিল আগেই। এমন মাহেন্দ্রক্ষণ যে কদাচিৎ আসে জীবনে!
অপরদিকে নিউজিল্যান্ড এই রাতটিকে অবশ্যই ভুলতে চাইবেন। আর হাত কামড়াবেন –
কেন অফস্পিনার নিলাম না, কেন গ্লেন ফিলিপসকে বল দিলাম না। কেন আগে ব্যাটিং নিলাম না!








