এক বিদ্যালয়ে ছাত্রী ছয়জন, শিক্ষিকা তিনজন
অভিজিৎ হাজরা, বাগনান, হাওড়া: একদিকে বিদ্যালয়ে ছাত্রী সংখ্যা মাত্র ছয়জন, অথচ শিক্ষিকার সংখ্যা তিনজন। আবার একই ব্লকের অন্য একটি বিদ্যালয়ে পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় একশো হলেও স্থায়ী শিক্ষিকা রয়েছেন মাত্র একজন। এমনই বৈপরীত্যপূর্ণ চিত্র সামনে এসেছে গ্রামীণ হাওড়া জেলার বাগনান ২ নম্বর ব্লকের দুটি আপার প্রাইমারি বিদ্যালয়ে। বাগনান ২ নম্বর ব্লকের বরুন্দা গ্রামে অবস্থিত বরুন্দা নবাসন নিউ সেট আপ আপার প্রাইমারি বালিকা বিদ্যালয়-এ বর্তমানে পঞ্চম থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ছাত্রী মাত্র ছয়জন। এর মধ্যে পঞ্চম শ্রেণিতে একজন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে চারজন এবং সপ্তম শ্রেণিতে একজন ছাত্রী রয়েছে। অষ্টম শ্রেণিতে বর্তমানে কোনো পড়ুয়াই নেই। অথচ এই বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন তিনজন স্থায়ী শিক্ষিকা।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়টি ২০১০ সালে বাম আমলে পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চালু হয়েছিল একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনে। সেই সময় ছাত্রীর সংখ্যা ছিল শতাধিক। পরে বিদ্যালয়ের জন্য আলাদা জমিতে নিজস্ব ভবন নির্মিত হয়। কিন্তু নতুন ভবনে স্থানান্তরের পর থেকেই ধীরে ধীরে ছাত্রীসংখ্যা কমতে শুরু করে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বিদ্যালয়ের পুরনো অবস্থানটি ছিল যাতায়াতের দিক থেকে সুবিধাজনক। কিন্তু নতুন ভবনে পৌঁছতে গেলে মুম্বাই সড়ক পার হতে হয়, যা অত্যন্ত দুর্ঘটনাপ্রবণ। দুর্ঘটনার আশঙ্কাতেই অভিভাবকরা তাঁদের মেয়েদের সেখানে ভর্তি করাতে চাইছেন না। বর্তমানে বিদ্যালয়ের নিজস্ব ভবনটি দ্বিতল বিশিষ্ট। মোট পাঁচটি শ্রেণিকক্ষ থাকলেও পড়ুয়ার অভাবে নীচতলার তিনটি কক্ষ তালাবন্ধ অবস্থায় রয়েছে। দোতলায় একটি কক্ষে পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির ছয়জন ছাত্রীকে আলাদা করে বসিয়ে পাঠদান করা হয়। অন্য একটি কক্ষ অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ছাত্রীসংখ্যা কম থাকায় মিড-ডে মিলের রান্নার ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে পাশের একটি হাই স্কুলের সঙ্গে। সেখান থেকেই প্রতিদিন রান্না করা খাবার এসে পৌঁছয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষিকারা জানান, প্রতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতে তাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের মেয়েদের স্কুলে ভর্তি করানোর অনুরোধ করেন, কিন্তু তাতে তেমন কোনো সাড়া মেলে না। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই তিন শিক্ষিকাই স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিযুক্ত—দু’জন ২০১০ সালে এবং একজন ২০১৩ সালে।
অন্যদিকে, একই ব্লকের ছয়ানি গুজরাট নিউ সেট আপ আপার প্রাইমারি বিদ্যালয়-এর চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সেখানে পড়ুয়ার সংখ্যা ৯৭ জন হলেও স্থায়ী শিক্ষিকা রয়েছেন মাত্র একজন। শিক্ষক সংকট মেটাতে গ্রামবাসীরা চাঁদা তুলে কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকাকে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ করেছেন। গ্রামবাসীদের দাবি, যে বিদ্যালয়গুলিতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন, সেখান থেকে উদ্বৃত্ত শিক্ষকদের এই বিদ্যালয়ে বদলি করা হলে পঠন-পাঠনের সমস্যা অনেকটাই মিটবে। এই প্রসঙ্গে বরুন্দা নবাসন নিউ সেট আপ আপার প্রাইমারি বালিকা বিদ্যালয়ের টিচার-ইন-চার্জ শতাব্দী বন্দ্যোপাধ্যায় ছাত্রীর সংখ্যা কম থাকা বা ছাত্রী-শিক্ষিকা অনুপাত নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
উলুবেড়িয়া অতিরিক্ত জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক শেখর মণ্ডল জানান, সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের সমস্যার কথা তাঁদের জানা আছে এবং বিষয়টি স্কুল শিক্ষা দফতরের নজরে আনা হয়েছে। বাগনান ২ নম্বর ব্লক পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ সমরেন্দু সামন্ত বলেন, “যেসব বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন, সেখান থেকে শিক্ষক সংকট থাকা বিদ্যালয়গুলিতে বদলির প্রস্তাব দিয়ে জেলা শিক্ষা দফতরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখনও পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।”








