সুন্দরবনে মধু সংগ্রহকারীদের দাবিতে বনদপ্তরে ডেপুটেশন মানবাধিকার সংগঠনের
নতুন পয়গাম, হাসান লস্কর বাবলু, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, ১০ অক্টোবর: সুন্দরবনের জঙ্গলে মধু সংগ্রহের ক্ষেত্রে পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী তিন দফায় ‘মহল পাস’ চালু করার দাবিতে মঙ্গলবার বিকালে কুলতলীর দেউলবাড়ি অঞ্চলের গ্রামবাসী ও মৎস্যজীবীরা চিতুড়ি বনদপ্তরে এক ডেপুটেশন কর্মসূচি পালন করে। মানবাধিকার সংগঠন ‘এপিডিআর’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি চার দফা দাবিপত্র বনদপ্তর কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করা হয়।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাউথ ডিভিশন বনদপ্তরের অধীনস্থ এলাকায় ঐতিহ্যগতভাবে প্রতি বছর চৈত্র মাসে জঙ্গলে মধু সংগ্রহের জন্য মৌলে ও মৎস্যজীবীদের তিন দফায় মহল পাস দেওয়া হতো। প্রতিটি দফা ছিল ১৫ দিনের, অর্থাৎ মোট ৪৫ দিনের জন্য এই অনুমতি প্রদান করা হত। কিন্তু বিগত তিন বছর ধরে এই নিয়ম পরিবর্তন করে বনদপ্তর তিন দফার পরিবর্তে মাত্র এক দফায় মহল পাস দিতে শুরু করে। এই সিদ্ধান্তের ফলে চরম সমস্যার মুখে পড়েছেন সুন্দরবনের জঙ্গলনির্ভর জনজাতির মানুষজন।
এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর এর রাজ্য সম্পাদক আলতাফ আমেদ জানান, “পুরুষানুক্রমে যারা জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল, তাদের জঙ্গল ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে বনদপ্তর মৎস্যজীবীদের সমস্যা সৃষ্টি করে কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে সুবিধা দিতে উদ্যত হয়েছে।” তিনি অভিযোগ করেন, চুলকাটি, বনি, কলস ও কুলতলী ক্যাম্প এলাকায় গভীর জঙ্গলে ইউরোপীয় মৌমাছির কৃত্রিম বাক্স বসানোর অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রাকৃতিকভাবে জঙ্গলে উৎপন্ন মধুর পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে।
আলতাফ আমেদ আরও জানান, কৃত্রিম বাক্সের চাকের সামনে চিনি মেশানো হচ্ছে, যার ফলে সুন্দরবনের জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) প্রাপ্ত মধুর মান নিম্নমুখী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই নিম্নমানের মধু বিশ্ববাজারে সুন্দরবনের মধুর সুনাম নষ্ট করছে। বর্তমানে বনদপ্তর কর্পোরেট সংস্থাগুলি থেকে স্বল্পমূল্যে এই কৃত্রিম বাক্সের মধু সংগ্রহ করে নিজেদের চাহিদা পূরণ করছে, যার ফলে স্থানীয় মৌলেদের কাছ থেকে তাদের সংগ্রহ করা মধু সঠিক মূল্যে না নেওয়ার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে।
মানবাধিকার কর্মী মিঠুন মন্ডল এই সমস্যার তীব্রতা তুলে ধরে বলেন, “তিন দফা থেকে মহল পাস কমিয়ে এক দফা করার ঘটনা মৌলেদের জীবন-জীবিকার উপর সরাসরি আঘাত। সরকার ও বনদপ্তর জঙ্গলকে কোর এরিয়া ঘোষণা করে দিন দিন জঙ্গল সংকুচিত করছে, যার ফলে জঙ্গলবাসীরা কাজ হারাচ্ছে। অনেকে জীবিকার সন্ধানে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে অন্য রাজ্যে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।”
এপিডিআরের পক্ষ থেকে বনদপ্তরের কাছে নিম্নলিখিত দাবিগুলো পেশ করা হয়েছে:
১. জঙ্গলের মধ্যে কৃত্রিম মধুর বাক্স বসানো অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
২. বর্তমানে প্রচলিত এক দফার মহল পাস বাতিল করে পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী তিন দফায় মহল পাস চালু করতে হবে।
৩. মধুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে প্রতি কিলোগ্রামের দাম ৩৫০ টাকা বৃদ্ধি করতে হবে।
৪. সুন্দরবনের সমস্ত এলাকায় মধুর ক্রয়মূল্য একই হারে নির্ধারণ করতে হবে।
এই দাবিগুলো নিয়ে চিতুড়ি বনদপ্তরে ডেপুটেশন দেন মৎস্যজীবী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। বনদপ্তরের পক্ষ থেকে তাদের দাবিপত্র গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।








