গবেষণা ও সত্যের সন্ধানে কলকাতায় ইতিহাস সম্মেলন
নতুন পয়গাম, কলকাতা: সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড এক্সিলেন্স (CRE)-এর উদ্যোগে আয়োজিত দু-দিনব্যাপী ইতিহাস সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন রবিবার কলকাতার কলা মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের বিষয় ছিল ”বাংলায় মুসলমানদের প্রভাব ও তার গতিধারার উন্নয়ন।” দ্বিতীয় দিনেও ইতিহাস, সমাজ ও সমকালীন রাজনীতির নানা দিকের ওপর বিশ্লেষণমূলক আলোচনা হয়। এদিনের প্রোগ্রামে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশবরেণ্য ইতিহাসবিদ ড. রাম পুনিয়ানি, বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও লেখক সাইয়েদ সাইয়েদ সাদাতুল্লাহ হোসায়েনি, ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি ফোরামের ডিরেক্টর ডাঃ শাদাব মুসা, ওয়েস্ট বেঙ্গল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এর চেয়ারম্যান ডা. মসিহুর রহমান প্রমুখ। প্রারম্ভিক ভাষণ দেন আয়োজক সংস্থা সিআরই-র ডিরেক্টর অধ্যাপক মসিউর রহমান।ডা. মসিহুর রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেন, আজ পরিকল্পিতভাবে মুসলিম শাসনামলকে ইতিহাসের রাজনীতিকরণ ও সাম্প্রদায়িকীকরণের মাধ্যমে কলঙ্কিত করা হচ্ছে। বাংলায় ইসলামের আগমন এবং মুসলিম শাসনের ইতিহাসকে বিকৃত করে একটি নেতিবাচক ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলার প্রথম মুসলিম শাসক বখতিয়ার খিলজিকে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার ধ্বংসের খলনায়ক হিসেবে তুলে ধরা হলেও এর ঐতিহাসিক সত্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। একইভাবে ঔরংজেবকেও পরিকল্পিতভাবে কালিমালিপ্ত করা হয়েছে। মুসলিম শাসনের পূর্বে বর্ণভেদ প্রথা হিন্দু সমাজের জীবনীশক্তিকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল। উচ্চবর্ণের অত্যাচারে নিম্নবর্ণের মানুষ নিপীড়িত ও নিষ্পেষিত হত। মুসলিম শাসকেরা এসে সমাজকে বর্ণভেদ প্রথা থেকে মুক্ত করেন এবং শান্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি মুসলিম শাসনামলে শিক্ষা, নৈতিক প্রশিক্ষণ, পানি সরবরাহ, সেচব্যবস্থা ও পয়ঃপ্রণালী নির্মাণে ব্যাপক পরিকাঠামোগত উন্নয়ন হয়। সুফিরা সমাজসংস্কার ও সমাজসেবায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং রাজ অনুগ্রহের প্রত্যাশী না হয়ে মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন।
তিনি আরও বলেন, স্বামী বিবেকানন্দ নিজেই উল্লেখ করেছিলেন, বাংলায় ইসলামের বিস্তার ঘটেছিল সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শের কারণে। মুসলিম শাসকেরা ভিনদেশ থেকে এলেও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ভারতবাসীর ভাগ্যোন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। অস্পৃশ্যতা ও ছুঁতমার্গের অবসান ঘটিয়ে তাঁরা সমাজে অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ডা. মসিহুর রহমান অর্থনৈতিক প্রসঙ্গে বলেন, ঔরংজেবের আমলে বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ২৮ শতাংশ ভারতের ছিল, যেখানে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের অবদান মাত্র ৩-৪ শতাংশ। তিনি ইবন বতুতার বিবরণ উদ্ধৃত করে বলেন, সেই সময়ে আইনশৃঙ্খলা ও আইনের শাসন বজায় ছিল, যা ব্রিটিশ শাসনামলে ভেঙে পড়ে এবং বিপুল সম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার হয়।

ইতিহাসবিদ ড. রাম পুনিয়ানি
ডাঃ শাদাব মুসা বলেন, আজকে দেশের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ইতিহাস। মুসলমানদের হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অবদানকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। ভুয়ো ন্যারেটিভ তৈরি করে মুসলিম শাসনামলকে ভারতীয় সভ্যতার ‘অন্ধকার যুগ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, মুসলিম শাসনামলের বাংলায় ইউরোপের তুলনায় বহু গুণ বেশি রেয়ন, রেশম ও টেক্সটাইল উৎপাদন হত। দিল্লি কলেজের সূচনা হয়েছিল মাদ্রাসা গাজিউদ্দীন থেকে। এসব ইতিহাস পরিকল্পিতভাবে আড়াল করা হচ্ছে।
ড. রাম পুনিয়ানি তাঁর বক্তব্যে বলেন, গত এক দশকে মুসলমানদের সর্বদিক থেকে কোণঠাসা করার অপচেষ্টা চলছে। শুধু ভারতে নয়, বিশ্বজুড়েই। ‘ইসলামিক টেররিজম’ শব্দবন্ধের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ধর্মকে দানবায়িত করা হচ্ছে, অথচ অন্যান্য ধর্মভিত্তিক সহিংসতার ক্ষেত্রে এমন শব্দ ব্যবহার করা হয় না। তিনি বলেন, দাঙ্গা আপনা-আপনি হয় না, দাঙ্গা করানো হয়। আর তাতে লাভবান হয় নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তি। ইতিহাসকে ভাগ করে প্রাচীন যুগকে স্বর্ণযুগ, মুসলিম শাসনামলকে অন্ধকার যুগ এবং ব্রিটিশ শাসনকে আধুনিক যুগ হিসেবে উপস্থাপন করার নেতিবাচক প্রবণতা তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
সাইয়েদ সাদাতুল্লাহ হোসায়েনি বলেন, ইতিহাস হল দেশ ও জাতির আমানত। এই আমানতের খেয়ানত হলে তার মাশুল জাতিকে শত শত বছর ধরে দিতে হয়। মুসলমানরা এদেশে মুসাফির হিসেবে এসে এদেশের সম্পদ এদেশের উন্নয়নেই ব্যবহার করেছেন। ভারতে চার হাজারেরও বেশি ঐতিহাসিক স্থাপনা মুসলিম শাসকদের দ্বারা নির্মিত, এবং দেশের শীর্ষ পর্যটন কেন্দ্রগুলির অধিকাংশই তার সাক্ষ্য বহন করে। তিনি বলেন, ঘৃণা, বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা দিয়ে কোনো দেশ কখনও দীর্ঘদিন শাসিত হতে পারে না।
সবশেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন ইতিহাস সম্মেলনের আহ্বায়ক গবেষক সাঈদ আল মামুন। সমগ্র সভা সঞ্চালনা করেন রিসার্চ অ্যান্ড এক্সিলেন্স (CRE) এর অন্যতম সদস্য ওসমান গনি।








