মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান
বিশেষ প্রতিবেদন
নতুন পয়গাম: বিশ্বের ইতিহাসে ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপ্রধানের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড বিরল হলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়গুলোর একটি। সামরিক অভ্যুত্থান, বিপ্লব, গণ-অপরাধ কিংবা রাজনৈতিক রূপান্তরের মুহূর্তে বিভিন্ন দেশ তাদের ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রনেতাদের বিচারের মুখোমুখি করেছে। কেউ আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন, কেউ আবার আত্মসমর্পণের পর নিহত হয়েছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধ আদালতে গতকাল সোমবার ১৭ নভেম্বর ২০২৫ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট ২০২৪ দেশ ত্যাগ করে দিল্লিতে অজ্ঞাতনিবাসে রয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হলেন দেশনায়ক। রাষ্ট্র ও জনগণের আলোর পথের দিশারি। রাষ্ট্র পরিচালনার সেই গৌরবময় চেয়ারে বসে নিজের কর্মফলে কেউ হন ধিক্কৃত, কেউ নন্দিত। কৃতকর্মের দায়ে গদি থেকে ছিটকে পড়তেই আবার রাষ্ট্রযন্ত্রের কঠোর বিচারের মুখে পড়তে হয়েছে অনেককেই। শেষমেষ কপালে জুটেছে শাস্তি-মৃত্যুদণ্ড! দেশে দেশে পথভ্রষ্ট সেসব অপশাসকের সংখ্যাও কম নয়! যারা বেঁচে থাকতেই তাদের দমন-পীড়ন আর নিষ্ঠুর শাসনের পরিণতি ভোগ করে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে পড়ে আছেন! ক্ষমতার দম্ভ ফুরাতেই দুঃশাসন, স্বৈরশাসন, গণহত্যা কিংবা একনায়কতন্ত্রের অভিযোগে এরা দাঁড়িয়েছেন কাঠগড়ায়। অনেকেরই জীবনের সমাপ্তি ঘটেছে ফাঁসির দড়িতে। এই নিবন্ধে তেমনই কয়েকটি ঘটনা সংক্ষেপে তুলে ধরা হল।
ব্রিটিশ রাজা প্রথম চার্লস:
১৬৪৯ সালের ৩০ জানুয়ারি, ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম চার্লসকে শিরচ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং পার্লামেন্টের সঙ্গে বিরোধের জেরে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন তিনি। বিচারকরা রায়ে তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক, হত্যাকারী এবং জনগণের শত্রু’ হিসাবে চিহ্নিত করে শিরচ্ছেদ করার নির্দেশ দেন।
ব্রিটিশ রাজা প্রথম চার্লস
আদনান মেন্ডেরেস:
আদনান মেন্ডেরেস তুরস্কের ইতিহাসে এক বিরল অধ্যায়ের প্রতীক। যেখানে একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত সামরিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। ১৯৬০ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর তাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, সংবিধান লঙ্ঘন ও দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। ইয়াসিয়াদা দ্বীপের বিশেষ আদালত দীর্ঘ বিচারের পর ১৯৬১ সালে মেন্ডেরেসকে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে।

আদনান মেন্ডেরেস, তুরস্ক
আমির-আব্বাস হোবেইদা:
১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আমির-আব্বাস হোবেইদাকে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির অধীন হোবেইদার সরকারকে বিপ্লবীদের ‘দমনকারী’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। তবে তার বিচার ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। সীমিত অধিকার ও অনিয়মের অভিযোগে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচিত হয় এটি।

আমির-আব্বাস হোবেইদা, ইরান
নিকোলাই চশেস্কু:
দীর্ঘ ২৪ বছর রুমানিয়া শাসন করেন কমিউনিস্ট নেতা নিকোলাই চশেস্কু। ১৯৮৯ সালে কমিউনিস্ট শাসনের পতনের সময় তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রীকে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। গণহত্যা ও ধ্বংসের অভিযোগে ওই বছরের বড়দিনে ২৫ ডিসেম্বর তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। আধুনিক রুমানিয়ার ইতিহাসে এটি ছিল শেষ মৃত্যুদণ্ড।

নিকোলাই চশেস্কু, রুমানিয়া
জুলফিকার আলী ভুট্টো:
পাকিস্তানের জনপ্রিয় নেতা ও প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ১৯৭৭ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। পরে বিতর্কিত হত্যা মামলায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে ১৯৭৯ সালে ফাঁসি দেওয়া হয়। দীর্ঘ চার দশক পর, ২০২৪ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট তাঁর বিচারকে ‘মারাত্মকভাবে ত্রুটিপূর্ণ’ ঘোষণা করে।

জুলফিকার আলী ভুট্টো, পাকিস্তান
সাদ্দাম হোসেন:
১৯৭৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ইরাকের শাসক ছিলেন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন। মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর আগ্রাসনের পর মানবতাবিরোধী অপরাধে তাঁকে ইরাকি ট্রাইব্যুনালে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে তাঁর মৃত্যুদণ্ড ছিল আধুনিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিচারগুলোর একটি।

সাদ্দাম হোসেন, ইরাক
মুয়াম্মার গাদ্দাফি:
লিবিয়ার দীর্ঘ ৪২ বছরের প্রেসিডেন্ট জেনারেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি ২০১১ সালে বিদ্রোহে ক্ষমতা হারান। আদালতের রায় ছাড়াই আটক হওয়ার পর প্রকাশ্যে গণপ্রহারে তাঁকে হত্যা করা হয়। এটা হয় মূলত মার্কিন ও ন্যাটোর মদদে। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে এবং লিবিয়ায় বিভক্ত রাজনীতির সূচনা হয়।

মুয়াম্মার গাদ্দাফি, লিবিয়া
মেংগিস্তু হাইলি মারিয়াম:
‘রেড টেরর’ নামের কুখ্যাত দমন-পীড়নের দায়ে ইথিওপিয়ার সাবেক দার্গ নেতা মেংগিস্তু হাইলি মারিয়ামকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত। তার অনুপস্থিতিতেই এই সাজা ঘোষণা হয়। বর্তমানে তিনি জিম্বাবুয়েতে স্বেচ্ছা নির্বাসনে নিরাপদে রয়েছেন।চুন দু-হোয়ান:
গওয়াংজু গণ-অভ্যুত্থান দমন এবং ১৯৭৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের দায়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট চুন দু-হোয়ানকে মৃত্যুদণ্ড সাজা ঘোষণা করে সে দেশের আদালত। পরে অবশ্য দণ্ড মুকুব হয় এবং তিনি রাষ্ট্রপতির ক্ষমা লাভ করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার গণতান্ত্রিক যাত্রায় এটি ছিল বড় টার্নিং পয়েন্ট।
মেংগিস্তু হাইলি মারিয়াম, ইথিওপিয়
জোসেফ কাবিলা:
২০০১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট থাকা জোসেফ কাবিলা ২০২৫ সালে তাঁর অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রদ্রোহ, বিদ্রোহ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। এটি বর্তমান সময়ের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক-আইনি ঘটনা। তবে তিনি গ্রেপ্তার হননি এবং অভিযোগ অস্বীকার করছেন।

জোসেফ কাবিলা, কঙ্গো
শেখ হাসিনা:
সোমবার ১৭ নভেম্বর ২০২৫ বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। হাসিনা ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ এবং পরবর্তীতে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত মোট ২০ বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে কয়েকশো দুর্নীতি, গুম, খুন, বিচার বহির্ভূত হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার এবং গণআন্দোলন দমন-পীড়নে গুলি চালিয়ে নির্বিচারে ছাত্র-জনতাকে হত্যার মতো গুরুতর সব অভিযোগ ছিল। এখনও বহু অভিযোগে মামলা চলছে।

শেখ হাসিনা, বাংলাদেশ
এছাড়াও ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুই, হাঙ্গেরির সমাজতান্ত্রিক নেতা ইমরে ন্যাগি, জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিদেকি তাজিকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।








