শীর্ষ ছাত্র থেকে চা দোকানদার — মহিদুলের জীবনের বাস্তব গল্প
আবু রাইহান, নতুন পয়গাম, কালিয়াচক:
সময় বড়ই বিচিত্র খেলোয়াড়। একসময় যে কিশোরকে দেখলে শিক্ষকরা বলতেন, “ওর মধ্যে একদিন বড় কিছু হওয়ার লক্ষণ আছে”, আজ সেই তরুণকে দেখা যায় রাস্তার ধারে ছোট্ট চায়ের দোকানে ব্যস্ত হাতে কাপ সাজাতে। তিনিই সাহাবাজপুর উমাচরণ হাই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র মহিদুল ইসলাম — একসময়ের স্কুল-তালিকার শীর্ষে থাকা নাম, আজ জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি এক সংগ্রামী মানুষ।
২০০৪ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় স্কুলে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন মহিদুল। তখন তাঁর নাম ছিল মেধার প্রতীক। পঞ্চম শ্রেণি থেকে শুরু করে মাধ্যমিক পর্যন্ত প্রতি বছরই প্রথম তিনের মধ্যে স্থান পেতেন। কোনো কোচিং নয়, কেবল মনোযোগ আর স্মৃতিশক্তির জোরে একবার চোখ বুলিয়েই মুখস্থ করে ফেলতেন পাঠ্যবই। উমাচরণ হাই স্কুলের উজ্জ্বল দিনগুলোয় তিনি ছিলেন সাফল্যের প্রতীক, সহপাঠীদের অনুপ্রেরণা।
কিন্তু জীবনের সমীকরণে সব সময় সমান থাকে না সব সংখ্যা। গোলাপগঞ্জ হাই স্কুলে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও আর উচ্চমাধ্যমিক দেওয়া হয়নি তাঁর। অভাব, অনটন, আর সংসারের ভারে থেমে যায় এক প্রতিশ্রুতিশীল জীবনের গতি। বাবার অসুস্থতা ও পরিবারের দায়ভার কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হন মহিদুল। একদিনের মেধাবী ছাত্র বসে পড়েন চায়ের দোকানের সামনে।
আজ সাহাবাজপুর বাজারে তাঁর ছোট্ট দোকানটিই জীবিকার অবলম্বন। দোকানের সামনে সারাদিন ভিড় লেগে থাকে—ভোরে নামাজ শেষে এলাকার প্রবীণরা, দুপুরে ব্যস্ত ব্যবসায়ীরা, আর বিকেলে স্কুলশিক্ষক ও তরুণেরা—সবাই আসে এক কাপ চায়ে ক্লান্তি ভুলতে। আশেপাশের দোকানে যেখানে চায়ের দাম ১৫–৩০ টাকা, সেখানে মহিদুলের হাতে তৈরি চা এখনও মাত্র ৫ টাকায়।
এই দোকানে হয় না রাজনীতি বা অর্থের দাপটের গল্প, হয় কেবল সাধারণ মানুষের সহজ কথাবার্তা, জীবনের টানাপোড়েনের ভাগাভাগি। মহিদুলের চায়ের কাপে হয়তো ব্র্যান্ডের স্বাদ নেই, কিন্তু আছে আন্তরিকতা, আছে এক নিঃস্বার্থ পরিশ্রমীর ঘ্রাণ।
দিনভর পরিশ্রমের পরও মহিদুলের মুখে নেই আক্ষেপের ছায়া। তিনি বলেন,
“সবাই ভাবে চা বিক্রি করা মানে ছোট কাজ। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, পরিশ্রমে কোনো কাজই ছোট নয়। চা বিক্রিও হতে পারে সম্মানের পেশা।”
আজ সেই বিশ্বাসই তাঁকে করে তুলেছে অনুপ্রেরণার প্রতীক। মেধা, সততা আর আত্মমর্যাদায় গড়া এই মানুষটি মনে করিয়ে দেন—জীবনকে জেতার জন্য বড় পদ বা বড় সুযোগ লাগে না, লাগে কেবল সৎ সাহস আর পরিশ্রম।








