তারানগরে নতুন করে নদী ভাঙন হারিয়ে গেল নূরজাহান মুর্শিদের পিতা-মাতার কবর, গৃহহীন অসংখ্য পরিবার
জহির উল ইসলাম, নতুন পয়গাম, লালগোলা:
লালগোলার তারানগর গ্রামে আবারও নতুন করে ভাঙন শুরু হল। পদ্মার করাল গ্রাসে নতুন করে বেশকিছু ঘরবাড়ি পদ্মাগর্ভে তলিয়ে গেল। গত ৩ সেপ্টেম্বর রাত ১২টার পর আকস্মিকভাবে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়। মানুষ হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। পর পর বেশ কয়েকটি বাড়িসহ বিস্তীর্ণ এলাকা নিমেষে নদীগর্ভে চলে যায়। অনেকেই কোনমতে প্রাণ নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে। চারিদিকে শুরু হয় ভয়াবহ বিভীষিকা। প্রতিবেশীদের সহায়তায় রাতের আঁধারে গৃহসামগ্রী সরিয়ে নেয়ার তৎপরতা দেখা যায়। এমন ভয়াল মুহূর্তে সম্প্রীতির এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে। বিপন্ন মুসলিম পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে জীবন বাজি রেখে প্রবীর ঘোষ, জয়ন্ত শীল, সঞ্জয় শীল, দুখু ঘোষ, লোটন ঘোষ, বিজয় দাস, সুদীপ, বাবুরাম প্রমুখ তরুণেরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। সেদিনের পর থেকে এখন পর্যন্ত থেমে থেমে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। কোন্ মুহূর্তে আবারও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে বলা যায় না। জানা গেছে আশেপাশের অন্তত ৭০টি বাড়ি বিপন্ন। মানুষ বাড়িঘর ভেঙে নিয়ে নদীতীরবর্তী এলাকা থেকে সরে যাবার চেষ্টা করছে। অন্তত তিন শতাধিক লোকজন গৃহহীন হয়ে পড়েছে। তাদের কেউ কেউ স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আশ্রয় নিলেও অনেকেই খোলা আকাশের নিচে দিন গুজরান করছে। মাথার উপর খোলা আকাশ থাকলেও পায়ের নিচে মাটি নেই। অসহায় মানুষের আর্তনাদে গোটা গ্রামের বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। গ্রাম জুড়ে ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ ভাঙনে নদীর করালগ্রাসে হারিয়ে গেল বিগত শতকের গোড়ার দিকে তৎকালীন ব্রিটিশ পুলিশ সার্ভিসের লালগোলা থানার পুলিশ প্রধান গ্রামের ভূমিপুত্র রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব স্বনামধন্য নূরজাহান মুর্শিদের পিতা আইয়ুব হোসেন বেগ ও তাঁর মাতা ক্ষতিমুন্নেসার কবর। সেই সঙ্গে সত্তরের দশকের ঠিক গোড়ার দিকে রাজ্যের যুক্তফ্রন্ট সরকারের কৃষিমন্ত্রী সামাউন বিশ্বাসের আবাসস্থলের শেষ চিহ্নটুকুও।
উল্লেখ্য গত বছর থেকে চলমান এই ভাঙন রোধে ইতিমধ্যে রাজ্য সরকার সাত কোটি বাহান্ন লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছে। ভরা বর্ষায় সেই টাকায় বালির বস্তা ও বাঁশ ফেলে কিছুদিন ধরে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করলেও শেষ মুহূর্তে সব চেষ্টায় বিফলে গেল বলে মনে করছে ভুক্তভোগী মহল। গ্রামবাসীরা হতাশ। তাদের আক্ষেপ, সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নেবার কারণে আজ আমাদের বাড়িঘর জায়গা জমি হারিয়ে পথে বসতে হল। উল্লেখ্য, গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ভূমিহীন পরিযায়ী শ্রমিক। তাদের পক্ষে নতুন করে জায়গাজমি কিনে বাড়িঘর করার সামর্থ্য নেই। তাই এই দুঃসময়ে তারা চায় সরকার তাদের পাশে এসে দাঁড়াক। একটুখানি খাস জমির পাট্টা তাদের হাতে প্রদান করুক। সন্তান-সন্ততি নিয়ে তাদের এই ছিন্নমূল জীবনের দ্রুত অবসান ঘটুক।








