চা বাগানের চিতাবাঘ নিয়ে বনদপ্তরের দুশ্চিন্তা, পুনর্বাসনের জায়গা সংকট ভাবাচ্ছে বনকর্তাদের
প্রীতিময় সরখেল, নতুন পয়গাম, ধূপগুড়িঃ
জলপাইগুড়ির চা বাগানে ক্রমশ বাড়ছে চিতাবাঘের উপস্থিতি। চা বাগান শ্রমিকদের কাছে চিতাবাঘ এখন শুধু হিংস্র প্রাণী নয়, বরং নিয়মিত আতঙ্কের কারণও হয়ে উঠেছে। কখনও শ্রমিকের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, কখনও বাড়ির উঠোন থেকে গৃহপালিত পশু তুলে নিচ্ছে এই ধরনের ঘটনা এলাকায় নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বনদপ্তরের কাছে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে অন্য কারণে। তা হলো উদ্ধার হওয়া চিতাবাঘ কোথায় ছাড়া হবে, সেই উপযুক্ত জায়গার অভাব এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।
গত এক মাসে ধূপগুড়ি মহকুমার বানারহাট এলাকা থেকে সাতটি চিতাবাঘ উদ্ধার হয়েছে। আগে চা বাগানে চিতা দেখা মাত্রই খাঁচা বসানো হতো। কিন্তু এখন নতুন নীতি অনুযায়ী, খাঁচা বসানো হবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী। বনকর্মীরা প্রথমে এলাকা পরিদর্শন করবেন, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করবেন, যাতে চিতাবাঘ মানুষের থেকে দূরে রাখা যায় এবং মানুষ নিরাপদে থাকতে পারে। সহবাস করতে পারেন, যদি চিতাবাঘ বারবার জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ঢুকে পড়ে বা চিতাবাঘের হামলায় বারবার চা শ্রমিক আহত হয়, তারপর প্রয়োজনে চিতাবাঘ ধরে নেওয়া হবে। কারণ উদ্ধার হওয়া প্রতিটি চিতাবাঘের জন্য বনাঞ্চল খুঁজে পাওয়াই এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উদ্ধার হওয়া চিতাবাঘদের জন্য খয়েরবাড়ি বাঘ পুনর্বাসন কেন্দ্র মূল জায়গা হলেও, কেন্দ্রটি বর্তমানে প্রায় পূর্ণ। এছাড়া গরুমারা জাতীয় উদ্যান এবং মরাঘাট জঙ্গলেও ইতিমধ্যেই অনেক চিতাবাঘ ছাড়া হয়েছে। ফলে বনদপ্তরের হাতে পুনর্বাসনের জন্য যথেষ্ট জায়গা আর নেই। বনকর্তারা আশঙ্কা করছেন, স্থান সংকটের কারণে চিতাবাঘ ছাড়ার পর তারা আবার জঙ্গলের বাইরে মানুষের বসতি এলাকায় ঢুকে পড়তে পারে। ইতিমধ্যেই মাল মহকুমার বিভিন্ন অংশে চা বাগানের পাশে রাস্তার ধারে চিতাবাঘ ঘুরে বেড়ানোর ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চা বাগান চিতাবাঘের জন্য আদর্শ স্থান হয়ে উঠেছে কারণ সেখানে সহজে খাদ্য পাওয়া যায়। কুকুর, মুরগি, ছাগল এগুলিই এখন তাদের প্রধান খাবার। চিতাবাঘ চা বাগানে আশ্রয় নিচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বাচ্চা প্রসব করছে। ফলে উদ্ধার হওয়া চিতাবাঘকে জঙ্গলে ছাড়া হলেও সেখানে তাদের সংখ্যা আরও বাড়ছে, যা জঙ্গলের আয়তন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
পরিবেশপ্রেমী সংগঠন ন্যাস-এর কর্মকর্তা নাফসার আলী বলেন, “যেভাবে চিতাবাঘ চা বাগানে আশ্রয় নিচ্ছে এবং বাচ্চা প্রসব করছে, তাতে চিতা-মানব সংঘাত যতদিন যাবে তত বাড়বে। বর্তমানে চিতাবাঘের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা চা বাগান কারণ সেখান থেকে অনায়াসে কম পরিশ্রমে তারা খাবার পায়। কুকুর, মুরগি, গৃহপালিত ছাগল সেই কারণেই চিতাবাঘ আরো বেশি করে চা বাগানকে বেছে নিচ্ছে। এবং চিতাবাঘ যেভাবে ধরা পড়ছে, যেই জঙ্গলে ছাড়া হচ্ছে এতে জঙ্গলের আয়তন কমে যাবে। এক সময় চিতাবাঘ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় ঘোরাফেরা করতে দেখা যাবে। যে এলাকায় ছাড়া হচ্ছে, সেখানে। আমাদের আশঙ্কা।”
চলতি বছরেই চিতাবাঘের হামলায় জলপাইগুড়িতে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় কুড়ি জন আহত হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে বনদপ্তর মানুষের সুরক্ষা ও চিতাবাঘ সংরক্ষণ উভয় দিকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। চা বাগানে চিতা দেখা দিলে কীভাবে নিরাপদ থাকা যায়, দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম, আতঙ্কে ছুটে না যাওয়া এসব বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে শ্রমিকদের মধ্যে।
জলপাইগুড়ি বন্যপ্রাণী বিভাগের সহকারী বনাধিকারী রাজীব দে জানান, উদ্ধার হওয়া চিতাবাঘ ছাড়ার জায়গা কমে যাওয়ায় বনদপ্তর সত্যিই দুশ্চিন্তায়। খয়েরবাড়ি পুনর্বাসন কেন্দ্র ও গরুমারা জাতীয় উদ্যানের জায়গা সীমিত। তাই আর তড়িঘড়ি খাঁচা বসানো হচ্ছে না। প্রথমে এলাকা পর্যবেক্ষণ, তারপর মানুষকে সচেতন করা হবে। প্রয়োজন হলে তবেই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মানব-প্রাণী সংঘাত কমাতে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি চা বাগানের চারপাশে বেড়া দেওয়ার কাজও শুরু হয়েছে। বনদপ্তরের ধারণা, এতে অন্তত শ্রমিকদের বসতি এলাকায় চিতাবাঘ ঢোকার পথ কিছুটা হলেও সীমিত হবে। ডুয়ার্সের চা বাগান থেকে ধারাবাহিকভাবে চিতাবাঘ উদ্ধার হওয়া পরিবেশ ও বনদপ্তরের কাছে বড় সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বনদপ্তরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন হচ্ছে, আগামী দিনে এই চিতাবাঘদের কোথায় নিরাপদভাবে ছাড়া হবে, যেখানে মানুষ ও বন্যপ্রাণী উভয়ই সুরক্ষিত থাকবে।







