পখন্না ফুলকিশোর দাস বাবাজির মেলায় হাজারো মানুষের পংক্তিভোজন
নতুন পয়গাম, সঞ্জয় মণ্ডল, বাঁকুড়া:
আজ থেকে প্রায় ৫৫০-৬০০ বছর আগে শ্রীচৈতন্যদেবের এক পার্ষদ কিশোর দাস হরিনাম বিলোতে বিলোতে এসে পৌঁছেছিলেন প্রাচীন পুষ্করিণী অধ্যুষিত জনপদ পখন্নায়। পরবর্তীকালে চৈতন্যদেবই তাঁর নামকরণ করেন ফুলকিশোর দাস। এই পখন্নাতেই তিনি স্থাপন করেন তাঁর বৈষ্ণব আখড়া, যা পরবর্তীকালে এই অঞ্চলের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ফুলকিশোর দাস এক ধনী ব্যক্তির মৃত পুত্রের দেহে প্রাণসঞ্চার করেছিলেন। সেই অলৌকিক ঘটনায় অভিভূত হয়ে উক্ত ব্যক্তি ফুলকিশোর দাস বাবাজিকে বিপুল পরিমাণ ভূ-সম্পত্তি দান করেন বলে জানা যায়। বিশেষত এলাকার বারুজীবী সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ছিলেন। তাঁরা ফুলকিশোর দাস বাবাজিকে ঈশ্বরজ্ঞানে পূজা ও ভক্তি করতেন।
ভক্তিপ্রাণ ফুলকিশোর দাস মাকুড়ি সপ্তমীর দিন থেকে বৈষ্ণব সেবা ও নামগানের সূচনা করেন। সেই ধারাবাহিকতাতেই জন্ম নেয় পখন্না ফুলকিশোর দাস বাবাজির মেলা, যা আজও নিরবচ্ছিন্নভাবে পালিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর মাকুড়ি সপ্তমী থেকে শুরু করে তিন দিন ধরে এই মেলা বসে পখন্নায়। এই মেলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল তিন দিনের পালা কীর্তন, বাউল ও কবিগানের আসর এবং সাধু–বৈষ্ণব সেবা। তাই অনেকেই একে ‘সাধু মেলা’ বলেও অভিহিত করেন। একদিকে যেমন সাধু–বৈষ্ণবদের সেবা করা হয়, তেমনই গৃহী বৈষ্ণব ও সাধারণ ভক্তদের জন্যও পংক্তিভোজনের আয়োজন থাকে। কয়েক হাজার মানুষ এই পংক্তিভোজনে অংশগ্রহণ করেন। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, বৈষ্ণব আখড়ার প্রসাদ গ্রহণে নাকি রোগব্যাধি থেকেও মুক্তি মেলে।
আজ ছিল বৈষ্ণব ভজনের দ্বিতীয় দিন। এদিন পখন্নার বৈষ্ণব আখড়ায় কয়েক হাজার ভক্ত প্রসাদ গ্রহণ করেন। এক সময় এই মেলায় অসংখ্য দোকানপাট বসত এবং মানুষের ঢল নামত। তবে কালের নিয়মে সেই দিনগুলি আজ শুধুই স্মৃতির পাতায় বন্দি। বর্তমানে পখন্না গ্রামের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও নাগরিক জীবনের পরিবর্তিত চাহিদার কারণে মেলার প্রাঙ্গণ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। রাস্তার দু’ধারে দোকান বসানোর মতো জায়গাও প্রায় নেই। আধুনিক বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বিকল্প মেলা প্রাঙ্গণ তৈরির বিষয়ে মেলা কমিটির কোনও উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ এখনও নজরে আসেনি। ফলে ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার অপূর্ব সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এই মেলা প্রতিবছরই একটু একটু করে ছোট হয়ে যাচ্ছে।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্য সরকারের আর্থিক সহায়তায় একটি বৃহৎ কীর্তন মঞ্চ ও সাধু–বৈষ্ণবদের থাকার জন্য কয়েক হাজার স্কোয়ার ফিটের ভবন নির্মিত হয়েছে, তবু শৌচালয় ও পানীয় জলের মতো মৌলিক পরিকাঠামোর এখনও ঘাটতি রয়েছে। আগামী দিনে রাজ্য সরকারের উদ্যোগে এই সমস্যাগুলির সমাধান হবে বলেই আশাবাদী এলাকাবাসী। এই মেলা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, পখন্নার নাগরিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন। শরকাঠির ছাউনির কীর্তন মঞ্চ থেকে শুরু করে আজকের সৌর আলোয় আলোকিত মঞ্চ- পখন্নার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল এই মেলা।
বদলে যাওয়া জীবনে মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও এসেছে পরিবর্তন। জেন-জি প্রজন্ম যেখানে বিরিয়ানি ও মোমোতে অভ্যস্ত, সেখানেও মেলায় ঘুরতে এসে তারাও ফিরে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী মেলার জিলাপি ও পাপড়ের স্বাদে। এইভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখে চলেছে পখন্না ফুলকিশোর দাস বাবাজির মেলা। ছাউনির কীর্তন মঞ্চ থেকে আজ সৌরআলোয় আলোকিত আধুনিক পরিসরে পৌঁছনো— এই মেলা পখন্নার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল।








